Source: Dibakar Roy on Pexels.com  

কি অপূর্ব সুন্দর! যাকে বাংলায় বলে একেবারে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য! যতই দেখছি, ততই চক্ষু চড়কগাছ... ইয়ে মানে, চোখ দুটি যেন আরামে জুড়িয়ে যাচ্ছে! অবশ্য এমন একটা জায়গায় এরকম একটা জলপ্রপাতের আবির্ভাব সত্যিই একেবারে বিরলতম!

তবুও তার অস্তিত্ব চোখের সামনে দেখে কী করে অস্বীকার করা যায়? অন্তত আমার পক্ষে তো সেটা একেবারেই অসম্ভব। সবে সপ্তাহ চারেক হলো এখানে এসেছি। আর একদিন হঠাৎ করেই এই জলপ্রপাতটা আবিষ্কার করে ফেললাম! হ্যাঁ, এটা আমার মতে আবিষ্কার করা! কারণ, এর আগে তো এ জলপ্রপাতের কথা কেউ জানত না কোনোমতে। যদিও এটা হোমো সেপিয়েন্সের তৈরি করা, প্রকৃতি একে সৃষ্টি করেনি। তবে মফস্বল এলাকায় এমন জিনিস এল কোথা থেকে? ওফ! সত্যি! যেন কোনো এক আজগুবি গল্প! কী হচ্ছে, না হচ্ছে, কিছুই বোঝা যায় না, অথচ শেষ পর্যন্ত গল্পটা শেষ হয়ে যায়।

রোজ দেখতে দেখতে একদিন ঠিক করে ফেললাম, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, থুড়ি, জলপ্রপাত নিয়ে একটা রিলস বানাব। আমি আসলে পেশায় বেকার—কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না! পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বেশিরভাগ যুবক-যুবতীর এখন এটাই পেশা। ওই যা! কোন রাজ্যে থাকি লিখে ফেললাম! কী হবে এবার? দূর! আমায় দিয়ে কিসসু হবে না। ছাতার মাথা রিলস বানিয়েই বা কী হবে? আমার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলোর রিচ তো একেবারে শূন্যে অবস্থান করে! অনেকটা ওই লাল পার্টির লোকেদের মতো! ধ্যাততেরিকা! আবার কিসব আলফালিয়া বকে মরছি! ভালো লাগে না ছাই! এটা গল্প লিখছি, না হাতির ডিম! এ গল্প আমার কেউ ছাপবে না! (যেন এখনও সব ছাপাখানায় ছাপা হয়!) যাই হোক, কত বেকার রিলস, পডকাস্ট, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদি প্রভৃতি থেকে বেশ ভালো মতো কামাই করে। আর আমি যেটাই করতে যাই, সেটাই ভণ্ডুল-মণ্ডুল করে ফেলি! সবাই, মানে বিশেষ করে আমার মা, ঠিকই বলে, আমার দ্বারা আর কিছুই করা হবে না।

শেষ পর্যন্ত একদিন সকালে নতুন কেনা ফোনের (যেটা আবার আমার মাতৃদেবীর টাকায় ক্রয় করিয়াছি) সাহায্য নিয়ে রিলস তৈরির জন্য বদ্ধপরিকর হলাম।

সবে নিজেদের বাড়ি থেকে ফোনের ক্যামেরা তাক করেছি উলটো দিকের সাদা বাড়ির দিকে, কারণ ওই বাড়ির ভদ্রমহোদয় আর মহোদয়ারা এই জলপ্রপাতের জন্মদান করেছেন! মনে অনেক আশা নিয়ে কাজ শুরু করতে যাব, এমন সময় বাধা-বিপত্তির উপদ্রব শুরু হলো!

আমার জননীর কণ্ঠস্বর কর্ণে সুধা বর্ষণ করিল—'এই সকালবেলায় কী শুরু করলি বল তো! ভিডিও করছিস কেন?'

আমি বললাম, 'রিলস বানিয়ে ফেসবুকে (আমার মা শুধু ফেসবুকটাই বোঝে, ইনস্টা-ফিনস্টা আর কিছুই বোঝে না, তাই শুধু ফেসবুকটার কথাই বললাম) দেবো...'

এটুকু বলেছি কি বলিনি, ব্যস! মা তো পুরো ক্ষেপে লাল! সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন করে ঝংকার আরম্ভ হয়ে গেল মায়ের গলায়—'সারাদিন বাড়িতে বসে থাকবি আর এইসব করবি! তোর বয়সি মেয়েরা দেখ, বিয়ে করে বাচ্চার মা হয়ে গেল! আর তুই? আমার ঘাড়ের ওপর বসে আছিস...'

কী আর বলি? এ তো একেবারে খাঁটি সত্যবচন—চাকরি নেই, আইনি বা বেআইনি কোনো রকম বর নামক প্রাণী নেই, আর আমার মতন কোনো প্রাণীর বোধহয় এই পৃথিবীতে থাকার উপায় নেই! নেপচুন বা প্লুটোয় গিয়ে বসবাস করা উচিত!

এইসব আগডুম-বাগডুম ভাবছি, এমন সময় আবার মাতাঠাকুরানীর অমৃতবাণী শ্রুতিগোচর হলো—'তুই এসব একদম করবি না, কোনো কাজ থাকে তো কর; নাহলে যা, সারাদিন যেমন ফোনের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকিস, তেমন থাক গিয়ে... এসব যেন আর না দেখি...'

আমি একটু মৃদু প্রতিবাদ করে বলি, 'তা বলে ওরা সারাদিন এত জল নষ্ট করবে আর সেটার কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না?'

মা বলে, 'পাশের বাড়ির দাদা কর্পোরেশনে গিয়েও অভিযোগ জানিয়েছে, কিছুই হয়নি। আর তুই ফেসবুকে দিলেই সব হয়ে যাবে?'

অতিশয় সত্য কথা! এখন তো তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে কিছু বললেই আরজিকর করে ছেড়ে দেবো শুনতে হয়! আর যার নুন খাচ্ছি, তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবশতই কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে চুপ করে যাই। আবার ফোন নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে দিই, যদি কোনো কনটেন্ট রাইটিংয়ের কাজ খুঁজে পাই...

কিন্তু সেই ঘটনা তো ঘটবার জো নেই! মানে, ওই কাজ পাওয়া! অবশ্য কাজ অনেক পাই, কিন্তু সবই নন-পেইড! তাই যাকে বলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই! এমন করে আর কদ্দিন চলবে, কে জানে! এদিকে পকেট গড়ের মাঠের থেকেও বেশি ফাঁকা!

মাঝে মাঝে মনে হয় চন্দ্রবিন্দুর চাঁদ হয়ে যাই! আর ভালো লাগে না বাপু! ধুর! তারপর মনে হয়, 'যাক না আআআ, এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না'...

আজ সন্ধ্যে থেকে ঘন কালো মেঘ করেছিল। খুব বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। আমাদের এই এলাকায় আবার এক ঘণ্টা জোরে বৃষ্টি হলেই মিনি ভেনিস হয়ে যায়! তাই মুখ গোমড়া করে একটা কনটেন্ট লিখছি, কারণ যেকোনো সময়ে কারেন্ট অফ হতে পারে! বাড়িতে বিকল্প কিছু নেই... এমন সময়, যা ভেবেছি তাই! হয়ে গেল লোডশেডিং! এই রে! ফোনের চার্জটাও তো প্রায় শেষ, আর বড়জোর দশ মিনিট আয়ু আছে। তাই প্রাণপণে লেখাটা শেষ করার চেষ্টায় ব্যস্ত রইলাম। এতক্ষণ সিলিং ফ্যানের শব্দের চোটে টেরই পাইনি, বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির শব্দ। ঠিক দশ মিনিট পর, রাত দশটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আমার সবেধন নীলমণি ফোনটি তার সমস্ত আলো নিভিয়ে অন্ধকারের দেশে পাড়ি দিল... ব্যস, খেল খতম! এবার বসে বসে বৃষ্টির শব্দ শোনা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই! কিন্তু সে উপায়ও যদি থাকত! পালে পালে মশা বাবাজিরা এসে কুটুস-কাটুস কামড় বসাতে থাকল! অতঃপর মশারি মশাইয়ের শরণাপন্ন হতে হলো...

বোধহয় একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। এমন সময় ঘুমটা ভেঙে গেল। ভীষণ তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ! জল খাবার জন্য খাট থেকে নামতে গিয়ে পা পড়ল প্রায় হাঁটু ছুঁইছুঁই জলে! এ কী কাণ্ড! এতই কি জল ঢালল আকাশ? রাস্তা ছেড়ে সোজা ঘরে ঢুকে পড়ল জল! এ কী মারাত্মক উন্নতি! এদিকে আমি তো আবার সাঁতারও জানি না, এমনই করিতকর্মা! ভয়ানক ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আবার খাটের ওপরেই ঝপাং করে নিজেকে সঁপে দিলাম। আর গলার ভেতর থেকে আধফোঁটা আওয়াজও বের করতে পারছি না, যে কাউকে ডাকব...

চারদিকে কী ভয়ানক অন্ধকার! এমন সময় আবার পাশের সাদা বাড়ির জলপ্রপাত আরম্ভ হয়ে গেল! এমন অলৌকিক কাণ্ড হয় কী করে? ওটা তো বিদ্যুৎচালিত বস্তু! তাহলে লোডশেডিংয়ের মধ্যে চলে কী করে? রাস্তার আলোগুলো আমার ফোনের মতোই দেহ রেখেছে! আমি আর ভাবতে পারি না। জ্ঞান যেটুকু ছিল, তা হারিয়ে অজ্ঞান হবার চেষ্টা করতে করতে অবশেষে সফল হলাম।

হঠাৎ কেমন একটা চিৎকার কানে এল—চোখ খুলে দেখলাম চারদিকে গরমের আর রোদের ছড়াছড়ি। সিলিং ফ্যানটা চলছে, কিন্তু হাওয়ারা কোথায় যাচ্ছে, তা হাওয়াই জানে! অথবা ফ্যানটা নিজে! তবে আমি যে কোনোভাবেই জানতে পারছি না, সেটুকু নিশ্চিত হয়ে চোখ তুলে দেওয়ালের দিকে চাইলাম। দেওয়ালঘড়ি বলছে সকাল দশটা। আর প্রতিবেশী সেই উপকারী কাকু সাদা বাড়ির উদ্দেশ্যে বলছে—'সারাদিন পাম্পটা চালিয়ে রেখে কোথায় যে সব যায়! সারাদিন ধরে জল নষ্ট হচ্ছে! রোজ এই এক জিনিস...'

বুঝতে পারলাম, আবার সাদা বাড়ির ছাদের নল থেকে অবিরাম জলপ্রপাত আরম্ভ হয়েছে! এটা বোধহয় সেদিনই থামবে, যেদিন সৌভাগ্যবশত পাম্পটা পটল তুলে চন্দ্রবিন্দুর চাঁদ হবে! ততদিন চলতে থাকুক অবিরাম জলপ্রপাত...

.    .    .