অমূর্ত ব্রহ্মোপাসনার আরাধনা-সংগীতকে বলা হয় ব্রহ্মসংগীত। এতে উপাস্যের রূপের বর্ণনা নেই, বরং তার মহিমাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাই ব্রহ্মসংগীতকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের সাধন-সংগীত বলা যায় না। আঠারো শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দু-তিন দশকে বাংলা গানে যে বিষয়গত লঘুতা, নিম্নরুচি ও সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন ছিল, ব্রহ্মসংগীত সেখানে গানের একটি উচ্চমান প্রতিষ্ঠা করেছিল দু’দিক থেকে। প্রথমত, গানের ভাবগত গাম্ভীর্য, সাত্ত্বিক দ্যোতনা ও শব্দবন্ধে তৎসম প্রয়োগ; দ্বিতীয়ত, সুর ও স্বরপ্রয়োগে তালের শুদ্ধতা, গভীরতা ও সূক্ষ্ম সৃজনশীলতার প্রয়োগ। এই ব্রহ্মসংগীতের সূচনা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। ১৮২৫ সালে তিনি ‘আত্মীয় সভা’ নামে একটি সমাবেশের প্রবর্তন করেন এবং সেখানে গায়করূপে যোগ দেন রামমোহনের শিক্ষক কালী মির্জা। ব্রহ্মসংগীতের সূচনা প্রকৃতপক্ষে এই আত্মীয় সভায়, কারণ তখনও ব্রহ্মসভা বা ব্রহ্মমন্দির কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ ব্যাপারে রামমোহন নিজেই হলেন পথিকৃৎ এবং রচনা করলেন বেশ কিছু ব্রহ্মসংগীত।
নিরাকার ঈশ্বরকে নিয়ে ভক্তিমূলক কোনো গান রচনার ধারা বাংলাগানে আগে ছিল না। উপাস্যকে নিয়ে সহজ লিরিক রচনা সে কালে সম্ভব ছিল না। তার জন্য প্রয়োজন ছিল আরও অন্তত একযুগের গান রচনার ধারা ও অনেক গীতিকারের সংযোগ। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ—ব্রহ্মসংগীতের বিবর্তনে ইতিহাসে এই দুই ব্যক্তি দুই মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জাত গীতিকার এবং তাঁর ছিল সুদীর্ঘ সাংগীতিক ঐতিহ্য। গান রচনায় তাঁর ছিল অনায়াস সাবলীলতা।
রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর কয়েকজন বিশিষ্ট বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে ব্রহ্মোপাসনার জন্য একটি নতুন সভা স্থাপন করেছিলেন। এই সভার প্রথম অধিবেশন হয় ১৮২৮ সালের ২০শে আগস্ট। এর নামকরণ হয়— “ব্রাহ্মসমাজ”। সে সময়ে লোকে এই সভাকে ব্রাহ্মসভা বলত। ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়েছিল জোড়াসাঁকোস্থিত কমল বসুর বাড়িতে। পরে চিৎপুর রোডের উপর ব্রাহ্মসমাজ গৃহ নির্মিত হলে ১১ মাস পরে গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠান ও উপাসনা হয়। প্রতি বছর ভাদ্র মাসে সমাজের জন্মদিনে পণ্ডিত দিয়ে দান-বিতরণ করা হতো। তাতে শ্রীযুক্ত দ্বারকানাথ ঠাকুর, কালীনাথ রায় ও মথুরানাথ মল্লিক বিশেষ আনুকূল্য করতেন। পরে কলকাতার এক প্রান্তে দ্বারকানাথের তরুণ পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তথা রবীন্দ্রনাথের বাবা “তত্ত্ববোধিনী সভা” স্থাপন করেন বাংলার ২১শে আশ্বিনে। সেই সভা ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্বাবধানের ভার গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে দেবেন্দ্রনাথের চেষ্টায় ১৮৪২ সালের ভাদ্র মাস থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয় এবং ১৮৪৬ সালের ২২শে ডিসেম্বর দেবেন্দ্রনাথ ও প্রমুখ যুবক রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ‘ব্রাহ্মধর্মে’ দীক্ষা গ্রহণ করেন। সেদিন থেকে ব্রাহ্মসমাজের ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা। এখন থেকে ব্রাহ্মরা আর আগের মতো সর্বধর্মের মানুষের মিলনের সংঘে সমবেত হওয়ার ভাব থেকে সংঘবদ্ধ হন না—এখন আবির্ভূত হলো ব্রহ্মধর্ম।
ব্রাহ্মসমাজ তিন ভাগে বিভক্ত— ১) আদি ব্রাহ্ম সমাজ, ২) নববিধান ব্রাহ্মসমাজ ও ৩) সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ। আদি ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আদি ব্রাহ্ম সমাজের সভায় মূলত প্রার্থনা-সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ক্রমাগত ব্রহ্মসংগীত লিখে গিয়েছেন।
হিন্দি উচ্চসংগীতের অনুসরণে ব্রহ্মসংগীতের সূত্রপাত করেন মহাত্মা রামমোহন রায়। পরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রেরণায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির উৎসাহ এ বিষয়ে সকলের অগ্রণী হয়ে ওঠে। ভাষা, ভাব ও সুরের মিলনে গুরুদেবের রচনা শেষ পর্যন্ত সকলকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের রচিত “রবীন্দ্রজীবনী”-তে উল্লিখিত একটি প্রসঙ্গের উল্লেখ এখানে করা যায়— “বর্তমান যুগে রাজা রামমোহন রায় ধর্মমন্দিরে সংঘ-উপাসনার প্রবর্তক, মন্দিরে উচ্চাঙ্গের তাল-মান-লয় সংযোগে গানের প্রবর্তন তিনিই করেন। রাজার আরম্ভ করা কাজ দেবেন্দ্রনাথের দ্বারা উজ্জীবিত হয়; তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে উৎকৃষ্ট সংগীতের ব্যবস্থা করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ নানারকম হিন্দি গান থেকে সুর আহরণ করে বা হিন্দি ভেঙে ব্রহ্মসংগীত রচনায় প্রবৃত্ত হন। রবীন্দ্রনাথের সম্মুখে ভগবদ্-বিষয়ক সংগীত রচনার আদর্শ তারা স্থাপন করে গিয়েছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথের জীবনে সংগীতের স্থান যে কতখানি, সে কথা তিনি লেখায় অনেক স্থানেই উল্লেখ করে গেছেন। বলেছেন— “গান লিখতে যেমন আমার নিবিড় আনন্দ হয়, এমন আর কিছুতেই হয় না।” তিনি অনুভব করেছেন, মুক্তি বলতে যা কিছু, তা এই গানের মধ্যেই। বিষ্ণু চক্রবর্তী ছিলেন আদি সমাজের গায়ক ও গুরুদেবের পরিবারের সংগীত শিক্ষক। এই বিষ্ণুই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সংগীতজীবনে প্রথম গুরু; তাঁর কাছেই গুরুদেবের ভারতীয় সংগীতে প্রথম হাতে খড়ি হয়। জীবনের আরম্ভেই গুরুদেব সংগীতে এমন একজন উদারচেতা সংগীতগুরু পেয়েছিলেন, যিনি তাঁর অন্তরকে সংগীতের রসে সিঞ্চিত করেছেন; কোনো সংকীর্ণতার দ্বারা মনকে সংকুচিত করেননি। রামমোহন রায়ের সময় থেকে বিষ্ণু ক্রমান্বয়ে একটানা ১২৮৯ সাল পর্যন্ত আদি ব্রাহ্ম সমাজের গায়কের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তারপর বার্ধক্যহেতু অবসর নেন।
উচ্চাঙ্গের ধ্রুপদ গান ঠাকুর পরিবারে শিশুরাও গাইত, কারণ বাড়ির নানা উৎসবের জন্য রচিত বাংলা ধ্রুপদগানে তাদের যোগ দিতে হতো। শিশু বয়সেই মাঘোৎসবে রবীন্দ্রনাথও বাড়ির অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গান গাইতেন। এই ধ্রুপদাঙ্গের ব্রহ্মসংগীত তাঁদের সেই শিশুবয়সকে কতখানি প্রভাবিত করেছিল, একটি ঘটনার উল্লেখে তা ধরা পড়ে। তিনি লিখেছেন— “কবে যে গান গাহিতে পারিতাম না, তাহা মনে পড়ে না। মনে আছে, বাল্যকালে গাঁদাফুল দিয়ে ঘর সাজাইয়া মাঘোৎসবের অনুকরণে আমরা খেলা করিতাম। সে খেলায় অনুকরণের সমস্ত অঙ্গই একেবারে অর্থহীন ছিল, কিন্তু গানটা ফাঁকি ছিল না। এই খেলায় ফুল দিয়ে সাজানো একটা টেবিলের উপরে বসিয়া আমি উচ্চকণ্ঠে ‘দেখিলে তোমার সেই অতুল প্রেম আনন্দে’ গান গাহিতেছি—বেশ মনে পড়ে।”
গুরুদেবের দাদাদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও সোমেন্দ্রনাথ হিন্দুস্থানী উচ্চসংগীতের বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ভাইদের মধ্যে প্রথম হিন্দি ভাষা থেকে বাংলা ব্রহ্মসংগীত রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন বরাবরই উচ্চাঙ্গের হিন্দি সংগীতের বিশেষ ভক্ত। তাঁর রচিত প্রত্যেকটি বাংলা উপাসনাসংগীত হিন্দি উচ্চাঙ্গ সংগীতের ঢালে রচিত। তাঁরই ইচ্ছা ও প্রভাবে তাঁর পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ উচ্চাঙ্গের হিন্দি সংগীত ভেঙে বহু ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে ধ্রুপদের সংখ্যাই অধিক। বিশুদ্ধ সংগীতের চর্চার জন্য পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তিনি এক হাজার টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। সংগীতে দেবেন্দ্রনাথের রুচিবোধ ছিল খুব মার্জিত। মৃতপ্রায় ভারতীয় সংগীতের মর্মলোকটিকে পুনর্জীবিত করাই ছিল মহর্ষির একটি বিশেষ আকাঙ্ক্ষা। সে ইচ্ছা তিনি সফল করে তুলতে পেরেছিলেন তাঁর পুত্রদের প্রতিভার ভিতর দিয়ে। এইজন্যই তাঁর পরিবার বাংলাদেশে যুগপ্রবর্তক হিসেবে বিখ্যাত হল। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ হলেন অনন্যসাধারণ।
হিসেব করলে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজে উপাসনার গান রচনায় হাত দেওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁর বাবা ও তাঁর দাদারা মিলে সর্বমোট প্রায় ৬০টি ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছিলেন। এইসব গান রচনায় যে কয়েকজন বড় বড় ওস্তাদ তাঁদের সাহায্য করেছিলেন, তাদের মধ্যে গৃহশিক্ষক বিষ্ণু চক্রবর্তী, রমাপতি বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিপুরের রাজচন্দ্র রায় ও যদুভট্টের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যদুভট্টের প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা ছিল গভীর। যদুভট্ট নিজে বহু সংগীত রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে তার কোনো কোনো হিন্দি গানের অনুকরণে বাংলাগান রচনা করতে দ্বিধা করেননি। ব্রহ্মসংগীত থেকে একটি গানের উল্লেখ— “আজি বহিছে বসন্তপবন সুমন্দ তোমারি সুগন্ধ হে...”। বাহার রাগিণীতে ও তেওড়া তালে যদুভট্ট রচিত গানটি হল— “আজু বহুত সুগন্ধ পবন সুমন্দ...”।
কবির প্রথম গীতিগ্রন্থ ‘রবিছায়া’-র প্রথম গান— “নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়।” গীতবিতানের গ্রন্থপরিচয় বিভাগে জানানো হয়েছে, এ জাতীয় কয়েকটি গানের রচনা ১২৮৫ বঙ্গাব্দের ৫ই আশ্বিনের আগেই হয়েছে। সেদিন থেকে ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ৬০-৬৫টি বছর অবিশ্রান্ত গান রচনা করে গিয়েছেন তিনি, যাদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—
১) তাঁর গানে অন্যে সুর দিয়েছেন অথবা অন্যের কবিতা বা মন্ত্রে তিনি সুর দিয়েছেন।
২) অন্যের সুরে তিনি কথা বসিয়েছেন— সেই সুর কখনো জ্যোতিরিন্দ্রনাথের, কখনো বা হিন্দুস্থানী অথবা দক্ষিণী গান বা ইউরোপীয় সুর; যাদের এক কথায় বলা যায় অনুসারী গান।
৩) তাঁর স্বকীয় গান— যে গানে কথা ও সুর তাঁর।
প্রথমদিকে অনুসারী গানের অধিকাংশ ধ্রুপদাঙ্গ, যার বিষয় ছিল উপনিষদসুলভ ও ব্রহ্মসুলভ। এইসব গানের কথায় একটি পূর্বাদর্শের অনুসরণ চোখে পড়ে— সেটি রামমোহন প্রবর্তিত ব্রহ্মসংগীতের আদর্শ। ১২৮৭ বঙ্গাব্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ বাড়ির উপাসনার জন্য গান রচনা শুরু করেন। এছাড়াও মাঘোৎসব উপলক্ষে ভিন্ন ভিন্ন উপাসনাসংগীত রচনা করেন। নাগরিক জীবন তথা সাধারণের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা প্রায় প্রথম যিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তিনি হলেন ব্রহ্মসংগীতের রূপকর্তা রামমোহন রায়। ব্রহ্মসংগীতের কাঠিন্য, নীরসতা বর্জন করে রবীন্দ্রনাথ তাতে রসসঞ্চার করেন। পরম ব্রহ্মের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, মানুষের প্রাণের কথা বহন করে একের পর এক সংগীত রচিত হয়েছে। মানুষের সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস—সবকিছুই প্রকাশ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের গানে—
“নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে/ শুভ্র সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে...”।
তিনি জানতেন, কথা ও সুরের সামঞ্জস্যে সৃষ্টি হয়েছে যে সংগীত, তাই শুধু মানুষের কথা বলবার দাবি রাখে। নতুনের সন্ধানী কবি সর্বদা প্রশ্রয় দিয়েছেন নতুন যা কিছুকে।
নতুনের পিয়াসী রবীন্দ্রনাথ নিত্যই ঘুরে ফিরেছেন নতুনের সন্ধানে। তাঁর গানের অবসরেও তাই নতুনের ছোঁয়া লেগেছে। রবীন্দ্র পরিবারের ধ্রুপদ সম্পর্কে আগ্রহের কথা সুবিদিত। এই ধ্রুপদের চারতুককে তিনি আরোপ করেছিলেন ব্রহ্মসংগীতের রচনা পদ্ধতিতে— স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ। ধ্রুপদের নিয়মানুযায়ী সুরগত বিভাজন রবীন্দ্রপূর্ব ব্রহ্মসংগীতে কখনও কখনও প্রভাব লক্ষ্য করার মতো। গান শুরু হওয়া থেকে তার আবেশ সৃষ্টি ও রেশকে ধরে রাখার তাগিদে যে নতুন পদ্ধতি রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীতের আবেদন সৃষ্টিতে পাওয়া গেল, তা সত্যিই এক অনাস্বাদিত আনন্দের প্রকাশ।
“মোর বীণা ওঠে কোন্ সুরে বাজি, কোন্ নব চঞ্চল ছন্দে...” এমনি গানে রাগ-রাগিণী ও তালের পরিচয় মেলে। যেমন—
১) ‘অনিমেষ আঁখি... বুঝি দৃষ্টি ঢেকেছে’
রাগ— দেশ, তাল— আড়াবেকা।
২) ‘অন্তর মম বিকশিত করো... নন্দিত করো হে’
রাগ— ভৈরবী, তাল— একতাল।
৩) ‘আজি কোন্ ধন হতে... থাকো থাকো চিরাবাঞ্ছিত’
রাগ— মিশ্র কেদারা, তাল— ছৌতাল।
উচ্চাঙ্গ সংগীতের ধ্রুপদের ‘চারতুক’ তাঁকে আকর্ষণ করেছে। এই প্রসঙ্গে বলা আবশ্যক, রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসংগীতের অবয়ব বিশ্লেষণ করলে দুটি বিষয় অবশ্যই বিচার্য— একটি কথা আর অপরটি সুর। এই সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি ঠিক চারতুকে গানটিকে বেঁধে তার মধ্যেই গানের অর্থকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। সুরের ক্ষেত্রেও তাই দেখা যায়— মন্ত্র, মধ্য ও তার— এই তিন সপ্তকের মধ্যেই এর আনাগোনা। যার ফলে তাঁর ব্রহ্মসংগীতের সুরবৈশিষ্ট্য এক নতুনত্বের, এক বিশিষ্টতার স্পর্শ পায়।