image by pixabay.com

গোলাপের লাল কুঁড়ির উপর জলের ছিটা পড়ে তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। তার উপর আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে। আকাশে বাতাসে যেন বয়ে বেড়াচ্ছে প্রেমের ভেলা। এই ভেলায় চড়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করা যায় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, বানের জলে মৃদু স্রোতে পাক খেতে খেতে চেনা ঘরে ঠিক পৌঁছে যাওয়া যায়। তুলে আনা যায় কটা হেঁজে যাওয়া শালুক, কপাল ভালো হলে পদ্মবনেও যাওয়া যায় বিষাক্ত সাপের ভয় কাটিয়ে। তবে আজ শুধুই গোলাপের দিন। রিনি অনেক দিন থেকে অপেক্ষা করছে আজকের দিনটার জন্য। আগামীকাল ইউনিভার্সিটির শেষ ক্লাস। জয় আর রিনি সেই কলেজ জীবন থেকে একে অপরের সোলমেট বলেই সবাই জানে। তবে জয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনোদিন ভালোবাসার কথা জানায়নি। রিনি এত বছর ধরে ছবির মতো স্বপ্ন সাজিয়েছে জয়কে নিয়ে। আজ শুনেছে জয় নাকি একশোটা গোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কথা জানাবে রিনিকে। সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটা আজ আসবে তাহলে। বিশ্বাস করতে পারছে না রিনি। জয় একটু আগেই ফোন করে বলেছে –

‘আজ তালতলার পুকুরধারে বিকেলে একটু আসিস। কিছু কথা আছে। আর শোন, একটা আসমানী রঙের শাড়ি পরে আসিস।’

একটা স্বপ্নের জলছবি যেন ভেসে উঠছে। কাঁচা হলুদ রঙের লাবণ্য রিনির টলটলে শরীরে। এক ঢাল বাদামি চুল, টানা টানা কালো চোখ, মেঘের কোলে পাঁচিল দেওয়া ভুরু। জয় ওকে সেই কলেজ জীবন থেকে আগলে রেখেছে। কোনো ছেলে কথা বলতে এলে তার সাথে খণ্ডযুদ্ধে নেমেছে, মায়ের থেকে বেশি করে টিফিন করিয়ে নিয়ে এসেছে, বৃষ্টির দিনে ওর ছাতাটা রিনিকে দিয়ে নিজে ভিজতে ভিজতে বাড়ি গেছে। যতটা ভালোবাসার জন্য করেছে, তার থেকেও বেশি করেছে সবাইকে এটা বোঝানোর জন্য যে রিনি শুধু ওর। রিনির উপর আর কারও অধিকার নেই। আজ সেই কলেজ শেষ হয়ে ইউনিভার্সিটিরও শেষ হতে চলেছে। এতদিন ওকে দেখা যেত রোজ, কথা বলা যেত, জোর খাটানো যেত। রিনিও দিনে দিনে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল জয়ের উপর। জয় ছাড়া অন্য কারও সাথে ভবিষ্যৎ জীবনের কোনো খণ্ডচিত্রও আঁকতে পারত না।

আজ আসমানী রঙের একটা শাড়ি পড়ে তৈরি হয়ে নিয়েছে রিনি। বিকেলের কোণে দেখা আলোয় চারিদিক যেন রামধনু হয়ে উঠবে রিনি আর জয়ের জীবন। এক সূত্রে গেঁথে যাবে যৌবনের মান্দাসে পা দেওয়া দুটি হৃদয়। তালতলার পুকুরটাও সেজে উঠেছে আজ হৃদয়ের রঙ মিলান্তি কোলাজে। পুকুর পাড়ে এসে বসেছে রিনি। অনেক উঁচু ঘাট বাঁধানো পুকুরের চারদিকে সারি সারি তালগাছের ছায়া পড়েছে নীলচে জলে। রিনির এলোমেলো মনে হিমেল বাতাস লেগেছে। চেনা অচেনার দোলায় দোল দিচ্ছে মন। জয়ও সেই শোনা কথা মতোই একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে হাজির। লাল তোরায় মোড়া গোলাপের লালিমা রিনির রক্তিম অধরের দ্বারপ্রান্তে এসে আরও আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আজ আর কোনো কথা বলার দরকার নেই। মাঝে মাঝে মুখের কথার থেকেও উদ্দেশ্য বস্তু যেন অনেক গোপন অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ করে দেয়। এই গোলাপগুলোও তাই করল। তবু জয় না বলে থাকতে পারল না –

‘আমার সাথে জীবন কাটাবি, রিনি?’

  • রিনি – ‘তুই ছাড়া তো কারও কথা ভাবিনি কখনও।’
  • জয় – ‘এরপর একটা চাকরি খুঁজব, তারপর তোর বাড়িতে বিয়ের কথা বলব।’
  • রিনি – ‘সে বিয়ে হোক আর যাই হোক, আমার সাথে কিন্তু প্রতি বছর এই দিনটাতে একখানেই দেখা করতে আসতে হবে, এইরকম লাল গোলাপ নিয়ে।’
  • জয় – ‘আমি যতদিন বাঁচব, ঠিক আসব।’

কিন্তু জীবনের সব হিসাব কি আমাদের নিজের জমা খাতার মতো করে চলে? কিছু ধার-দেনা তো ঈশ্বরকৃতও হয়। যা প্রয়োজনের বাইরে, হিসাবের বাইরে, তাই জুড়ে যায় কখনও কখনও জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রিনি আর জয় এতটাই ব্যস্ত ছিল যে কখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এসেছে বুঝতেই পারেনি। পুকুরের জলে এখন আর তালগাছের ছায়া পড়ছে না। নীল জলটা কখন যে কালো হয়ে এসেছে প্রকৃতিও হয়তো বুঝতে পারেনি। রিনির হাতটা জয় ওর বুকে ধরে রেখেছে। এই ধরে রাখা যেন অমলিন হয়ে থাকবে। কখন যে রিনি নিজের হাতটা ছাড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছে, নিজেও জানে না। জয় ওর চুলের উপর আলগা হাতের ছোঁয়ায় আরও কাছে টেনে নিয়েছে। তালের সারির ছায়া যেমন নীল জলে ডুবে গিয়েছিল, দু’জোড়া ঠোঁটও ডুবে গিয়েছিল সেইভাবে।

ভালোবাসার ঠিক বিপরীত বলে যদি কিছু হয়, তা হল হিংসা। ভালোবাসার পাল্লা যখন ভারী হয়, হিংসাও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে দাঁড়িপাল্লায় জিতে যাবার জন্য। আজও তাই হল – তালপুকুরের দক্ষিণ দিকের পাড়ে সন্ধ্যের দিকে বসে মদের আড্ডা। আগে এখানে ছিট কাপড়ের কারখানা ছিল। ওটা বন্ধ হয়ে যাবার পর বেকার বখাটে ছেলেগুলো মদের ও আরও অনেক কিছুর নেশায় নিজেদের নিয়োজিত করেছিল। ওরা সবে বসেছিল দেশি মদের পসরা নিয়ে। কে যেন এসে বলল –

‘আরে তোরা মদই খা। ওখানে মধু খেয়ে চলে যাচ্ছে অন্য লোক।’

‘মানে! আমরা থাকতে অন্য লোকে মধু খেয়ে চলে যাবে, তাই হয়? চল তো দেখি।’

কিসের হিংসা, কিসের কামনা, ওরা নিজেরাও জানে না। ওরা শুধু জানে রোজগার করতে না পারার অক্ষমতা, জীবনে সার্থকতার ব্যর্থতা। এতেই এত আক্রোশ আসে কীভাবে, ওরাও জানে না। ওরা শুধু জানে নেশার টান, অনেক কষ্টে উপার্জন করা টাকায় রিচার্জ করা ফোনের নীল ছবির কাম-উত্তেজনা। মোট ছ’জন ছুটে গেল ওরা পুকুরের দিকে। জয় আর রিনিকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে আরও বেড়ে গেল ওদের রাগ। নিজের ভালোবাসার মানুষকে এভাবেও সোহাগ করা যায় — এটা ওদের কল্পনার বাইরে। ওরা জানে সারাদিন অশান্তির পর রাত্রিবেলা ক্ষুধার্ত শরীরে নারী-রূপী সুস্বাদু খাদ্য ভক্ষণে। মাথায় আগুন জ্বলে উঠল ওদের। তরতরিয়ে নেমে গেল সোজা পুকুর পাড়ে।

‘কি হচ্ছে এখানে? পুকুর পাড়ে প্রেম চলছে?’

রিনি কোনো কথার উত্তর না দিয়ে জয়কে টেনে তুলল। তারপর চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হতেই একজন টান দিল রিনির শাড়ির আঁচল ধরে। অনেক ছাড়ানোর চেষ্টা করল জয়। অনেক হাতে-পায়ে ধরে দাদা-কাকু বলে নিজের সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা করল রিনি। কিন্তু এতই কি সোজা! ওরা ছ’জন উন্মত্ত নেকড়ে। জয় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করার জন্য ওর মাথায় বড় একটা থান ইট দিয়ে কে যেন মারল। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারাল জয়। ওকে টেনে হিচড়ে পুকুরের ধারে কাদার পাঁকে ফেলে দিল। এখানে চারিদিকে ফণীমনসার ঝোপ। জয়ের শরীর ক্ষতবিক্ষত হল। আর রিনি! তার কথা বলার কি আর অপেক্ষা রাখে। মুহূর্তেই ওর আসমানি রঙের শাড়িটা ভাসিয়ে দিল ওরা তালপুকুরের জলে। রক্তে ভেসে গেল রিনির শরীর। শুধু ওরা ছ’জন নয়, আরও অনেক কিছু ওদের হাতে। তারাও তাদের লোলুপ লিপ্সার শিকার করল রিনিকে।

রাত যখন ন’টা বাজে তখন রিনির জ্ঞান আসে। নিজের বিবস্ত্র শরীরটাকে কোনো রকমে ঢেকে রিনরিনে খোনা স্বরে জয়কে ডাকছে। কোনো সাড়া না পেয়ে ভয় পায় খুব; তবে নিজের জন্য নয়, জয়ের জন্য। উঠে দেখার ক্ষমতাও নেই ওর। কখন আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে জানেই না। এবার জ্ঞান ফেরে ঐ দুষ্কৃতিদের। বাড়ি ফিরে যখন মদের নেশা কাটে তখন ভয় বাসা বাঁধে মনে। দেখে যা মনে হয়েছিল ছেলেমেয়েদুটোর কেউই বাঁচবে না। তাই বলে প্রাণে না মেরে আসাটা ঠিক হয়নি ভেবে ওরা মাঝরাতেই গা ঢাকা দেয়।

ভোরের আলো যখন ফোটে তখন স্থানীয় মানুষজনের চোখ কপালে ওঠে রিনির রক্তে ভেজা নিথর শরীর দেখে। রিনির বাবা-মা সারারাত উদ্ভ্রান্তের মতো খোঁজাখুঁজির পর স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়। জানা যায় রিনি জেনারেল হসপিটালে ভর্তি আছে। ছুটে যায় বাড়ির লোকেরা। কিন্তু কোথায় সেই আসমানি শাড়ি? পুরো নীল পোশাকে ঢাকা রিনির শরীর, নাক-মুখ দিয়ে নল ভরা, হাতে চ্যানেল করা, গালের মাংস খুবলে তুলে নেওয়া, ঠোঁটের চারিদিকে কালশিটে জমা দাগ, গলায় পশুর মতো আঁচড়ানো। এই বাইরের দৃশ্য দেখেই রিনির মা অজ্ঞান হয়ে গেছেন। একটু পর যখন পুলিশ আসে তখন বয়ান দিতে হয় কর্মরত ডাক্তার অতিক্রম দাশগুপ্তকে –

‘কি বলব, এত প্যাথেটিক। মেয়েটির বয়স বাইশ। গ্যাং রেপ, সেই সাথে ব্রুটাল ইনজুরি, মানে ইন্টারনাল অ্যাবনরমাল ইঞ্জুরি। বাঁচবে নাকি জানি না।’

কেঁদে কেটে পড়েন রিনির বাবা-মা –

  • ‘যেভাবেই হোক মেয়েটাকে বাঁচান ডাক্তারবাবু।’
  • ‘কিন্তু হলো কী করে এসব?’
  • ‘গতকাল ও জয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল।’
  • ‘জয়! হ্যাঁ, কাল রাতে বিড়বিড় করে জয়ের নাম বলেছে দু’একবার। তাহলে সে কোথায়?’

এবার খোঁজ পড়ে জয়ের। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে জয়কে খুঁজে পায় কাদায় মাখামাখি অবস্থায়। জয়ের মাথা ফেটে রক্ত বেরিয়েছে প্রচুর। হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পর জ্ঞান আসে জয়ের। তবে রিনিকে সেই খুঁজছে না জয়। জয়ের বাবা, মা, ভাই এসে জয়কে আগলে রেখেছে। কতক্ষণে ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারে সেই চিন্তায় ডাক্তারকেও কথা শোনাতে ছাড়ছে না। রিনির অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকেই যাচ্ছে। অতিক্রম যেহেতু কাল রাতে ওকে প্রথম ভর্তি নিয়েছে তাই ওকেই ব্যাপারটা সামলাতে হবে।

দু’দিন জমে মানুষে টানাটানি করার পর মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরেছে রিনি। অতিক্রম হাল ছাড়েনি কিছুতেই। বারবার মনে হয়েছে এত অল্পবয়সী একটা মেয়ে। এতটা জখম সহ্য করতে পারবে তো? ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে উঠেছে রিনি। কিন্তু কথা বলতে পারে না, খেতে পারে না। অতিক্রম আজ যখন রাউন্ডে এলো, নার্স তখন ওর গা মুছিয়ে দিচ্ছিল। খোলা পিঠে একঢাল বাদামি চুল পড়েছে। চোখ পড়তেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল অতিক্রম। এই দুদিনে রিনির শরীরের অনেকটা অংশই দেখেছে অতিক্রম। কিন্তু তখন ও একটা অসুস্থ শরীর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আজ সেই মরা ডালে যেন সবুজ আভা আসছে। কচি পাতায় আবার ভরে যাবে রিনির শরীর। দরজার পর্দাটা ভালো করে টেনে দিল অতিক্রম। কেউ যেন আর রিনিকে ওইভাবে না দেখতে পায়। স্নান করানো হয়ে গেলে অতিক্রম এসে রিনির ঠোঁটের পাশে জমে থাকা ক্ষততে ড্রেসিং করে দিল। তখনও রিনির মুখে বিন্দু বিন্দু জল জমে ছিল। নিজের রুমাল দিয়ে আলতো হাতে মুছিয়ে দিল। এই প্রথম রিনি চেয়ে দেখল অতিক্রমের দিকে। সেই চোখে রিনির জন্য এক অদ্ভুত মায়া, স্নেহ, যত্ন চোখে পড়ল। অস্ফুট বোবা কান্নায় ঘিরে ধরল রিনিকে। কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু চোখ দিয়ে নোনা জলের বন্যা বয়ে গেল। রিনির চ্যানেল করা হাতটা শক্ত করে ধরল অতিক্রম –

‘ওসব কথা মনে রেখো না। জীবন অনেক বড়। শরীর তুচ্ছ জিনিস, জ্বরজ্বালা হয়, রোগ হয়, রেপও হয়। তাই বলে কি সূর্য ওঠে না? ফুল ফোটে না? পাখি গান করে না? সব আগের মতোই থাকবে। শুধু তুমি ঠিক হয়ে ওঠো।’

এ কি শুধু একজন ডাক্তারের কথা, নাকি এই দু’দিনে মায়া পড়ে গেছে রিনির উপর? আগামীকাল রিনি বাড়ি যাবে। তাহলে আর দেখতে পাবে না ভুবনভোলানো ওই করুণ চাহনি? ভাবলেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। বেলা দশটায় রিনিকে নিতে আসবে ওর বাবা-মা। সকাল হওয়ার অনেক আগেই অতিক্রম চলে এসেছে। রিনি কথা বলতে পারছে না এখনো। একটা কাগজ আর পেন দিয়েছে অতিক্রম ওকে।

‘তোমাকে কিছু বলতে চাই, রিনি।’

রিনি লিখে উত্তর দেয় – ‘হ্যাঁ, বলুন।’

‘আমি জানি তোমার কান্নাটা শুধু এই ঘটনার জন্য নয়। তোমার মায়ের মুখে আমি সব শুনেছি তোমার আর জয়ের কথা। জয় সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছে, রিনি। খোঁজ নিতে আসেনি একবারও। সেই জন্যই এত দুঃখ তোমার। তাই না?’

রিনি – ‘সেদিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ছিল। ও অনেক গোলাপ নিয়ে এসেছিল আমাকে বিয়ে করার কথা বলতে। তারপর…’

রিনির হাত থেকে পেনটা নিয়ে নিল অতিক্রম। তারপর বলল –

‘জানো তো আমার একটা স্বপ্ন আছে। একটা গ্রামের বাড়ি হবে। সারাবাড়ি কমদামি ফুলগাছ থাকবে, পাশে থাকবে একটা দোলনা।’

রিনি আবার পেনটা নিয়ে লিখল –

‘আর আপনার পাশে থাকবে আপনার মতোই একজন ভালো মানুষ।’

‘পাশে যদি তোমাকে রাখতে চাই, রিনি? থাকবে? আমি ভালোবাসার থেকেও “ভালো একটা বাসার” কথা বিশ্বাস করি। সুখে দুঃখে যে বাসায় রামধনুরা রোজ একবার হলেও আসবে। প্রতিশ্রুতিরা ঘিরে থাকবে মনের দোঁআশ মাটিতে।’

দরজার বাইরে তখন রিনির বাবা-মা এসে হাজির। বাইরে চলে গেলেন বত্রিশ বছর বয়সী ডাক্তারবাবু। রিনিকে প্রস্তুত করে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলেন ওরা। হসপিটালের বারান্দায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রইলেন অতিক্রম। চোখে একরাশ প্রশ্ন, অভিমান নিয়ে মনে মনে বলছে — সব খারাপ স্মৃতি ভুলে যেও, রিনি। রিনিও যতদূর দেখা যায় তাকিয়ে থাকল ওর জীবনদাতার দিকে। রিনির শূন্য বেডের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল অতিক্রম। তারপর চোখ গেল নিজের প্রেসক্রিপশন প্যাডের দিকে। সেখানে লেখা ছিল –

‘যেদিন সব ক্ষত সেরে যাবে, আর কথা বলতে পারব, তোমাকেই প্রথম ফোন করব। কিন্তু নম্বরটা যে নেওয়া হল না।’

অতিক্রম মনে মনে খুব চাইলো রিনি আজই কথা বলতে পারুক। যদি একান্তই না পারে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি খুব বেশি দিন তো বাকি নেই। ওই ৩৬০ দিন মতো হবে হয়তো। অনেকগুলো গোলাপ ওর প্রাপ্য। আর অনেকটা প্রতিশ্রুতি, যা কোনোদিন ভাঙবে না। আসলে দিন বা মুহূর্তটা আপেক্ষিক, যা কিছু স্থির তা হল সঠিক মানুষ।

.    .    .

Discus