Source:  EqualStock on Unplash.com

'এই দাশদা, দেখুন না মাইরি, এ শালা কী বলছে?' সরকারবাবুর কথা শুনে ফাইলে নিবিষ্ট চোখটা তুলে সামনে তাকায় অমিত। ওর সামনে সরকারবাবু দাঁড়িয়ে—বেঁটে, মোটা, মাথাভর্তি টাক, মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক, মুখে বিরক্তি। তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন রোগা স্থানীয় লোক, প্রায় বছর চল্লিশ বয়স হবে, খালি গা, লুঙ্গিটা ওদেশীয়দের মতো ভাঁজ করে পরা। লোকটাকে চেনে অমিত, ওদের কারখানার লোডিং-আনলোডিং গ্যাঙে কাজ করে। এরা কারখানার স্থায়ী কর্মী নয়, একজন লেবার সাপ্লায়ার, সম্পত, তার অধীনে এরা কাজ করে। মুখ কাঁচুমাচু করে লোকটি একবার অমিত, আর একবার সরকারবাবুর দিকে তাকাতে থাকে।

'হোয়াট হ্যাপেন্ড, আন্না?' লোকটিকে জিজ্ঞেস করে অমিত। তামিলনাড়ুর এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেশীয় ভাষা ছাড়া একমাত্র ইংরেজিতে কথা বললে স্থানীয় লোকেরা তবু কিছুটা বুঝতে পারেন, তাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়ার একটা আশা থাকে। অমিতের কথায় ওর দিকে তাকায় লোকটি। তারপর মাথার দুপাশে দুটি হাতের তালু তেরছাভাবে রেখে ওকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করে। তারপর ওর হাতের একটা তালু ওর দিকে মেলে ধরে লোকটি, করুণ মুখে হাত কচলাতে থাকে। কিছু টাকা চাইছে বুঝতে পারে অমিত, তবু ওর চিন্তাটা সঠিক কিনা তা জানার জন্য সরকারবাবুর দিকে চেয়ে ইশারায় জানতে চায় কী দরকার। সরকারবাবু ইঙ্গিতে ওর চিন্তাকেই সমর্থন করেন।

কিন্তু এইসব কন্ট্রাক্টরের লেবাররা সরাসরি তো ক্যাশ থেকে পেমেন্ট পায় না। যা টাকা দেওয়ার তা কন্ট্রাক্টরকে দেওয়া হয়, সে তার লেবারদের পেমেন্ট করে। তাহলে তো ওর কন্ট্রাক্টর সম্পতকে ডাকতে হয়।

'সেটাই তো আসল সমস্যা,' সরকারবাবু জানালেন, 'সম্পত আজ উপস্থিত নেই। সে তার গ্রামের বাড়িতে গেছে। কাল ফিরবে। আর এই লেবারটি কাল তার গ্রামের বাড়িতে যাবে। তাই সে আজ কিছু টাকা চাইছে অ্যাডভান্স হিসাবে।'

'ওকে কীভাবে টাকা দেব? দেখুন না ওকে বলে—কাল সম্পত এলে সকালেই আমি টাকাটা দিয়ে দেব, ও টাকা নিয়ে চলে যাবে দেশের বাড়ি,' অমিত বলে।

সরকারবাবু এই কারখানায় অনেকদিন আছেন। তিনি অমিতের অসুবিধাটা বুঝতে পারলেন। লেবারটির দিকে তাকিয়ে বলেন, 'আন্না (দাদা/মহাশয়), সম্পত উর (দেশের বাড়ি) গোয়িং, টুডে নো পেমেন্ট। টুমরো সম্পত অফিস কামিং, দেন পেমেন্ট।'

সজোরে মাথা নেড়ে প্রতিবাদ জানায় লেবারটি। সে অমিতের দিকে মিনতি-মাখা মুখে তাকায়, বারবার এক হাতের মুঠিটা খুলে ওকে দেখিয়ে আবার মুঠি বন্ধ করতে থাকে। আন্দাজে ওর মনোভাব বুঝে প্রশ্ন করে অমিত, 'হাউ মাচ, আন্না? ফাইভ হান্ড্রেড?'

সজোরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় লোকটি। তামিলে কিছু একটা বলেও, কিন্তু সেটা এরা কেউ বুঝতে পারে না। লোকটা যেরকম নাছোড়বান্দা, ভাব দেখে বোঝা যায় টাকা না নিয়ে ছাড়বে না।

একটাই রাস্তা আছে। ফ্যাক্টরি ম্যানেজার মিস্টার চ্যাটার্জীকে দিয়ে যদি অ্যাপ্রুভ করিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু ওনার কাছে গেলে উনি তো প্রথমেই কারণ জানতে চাইবেন। সেটা না জেনে তো বসের ঘরে যাওয়া যাবে না।

হঠাৎ ওর চোখে পড়ে ওদের তামিল ডেলিভারি ভ্যান ড্রাইভার মূর্তি অফিস ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। মূর্তিকে ঘরে ডেকে নেয় অমিত, বলে, 'মূর্তি, আই নিড ইয়োর হেল্প। দিস পার্সন ইজ আস্কিং ফর সাম অ্যাডভান্স, মেবি ফাইভ হান্ড্রেড। প্লিজ নো দ্য কারেক্ট অ্যামাউন্ট অ্যান্ড হোয়াই হি নিডস দ্য মানি।'

একটু বদমেজাজি হিসাবে মূর্তির নাম আছে। সে একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকায়। তারপর তামিলে বেশ কর্কশ স্বরে ওকে প্রশ্ন করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর মূর্তি অমিতের দিকে তাকিয়ে বলে, 'স্যার, হি নিড ফাইভ হান্ড্রেড রুপিস। হি ইজ গোয়িং টু উর ফর ম্যারেজ।'

'ম্যারেজ? হুজ ম্যারেজ?' প্রশ্ন করে অমিত।

'হিজ ম্যারেজ।'

'হোয়াট! হিজ ম্যারেজ?'

'ইয়েস, হি ইজ টেলিং দ্যাট,' মূর্তি আর দাঁড়ায় না।

ভারতবর্ষের হোসিয়ারি শিল্পের মানচিত্রে তিরুপুরের নাম একদম প্রথম সারিতে আসে। সেই সুবাদে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ভারতবর্ষের প্রথম সারির সমস্ত কোম্পানির শাখা অফিস ও বিভিন্ন ধরনের কারখানা এই শহর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। এইরকম একটি কোম্পানির একটি কারখানাই আজকের এই ঘটনার পটভূমি। তাছাড়াও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অনুসায়ী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির অজস্র কারখানা ও অফিস এই শহর ও এর আশেপাশের অঞ্চলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে।

একটা কাজের দিনে তিরুপুরে যা লোক থাকে, হিসাব করলে দেখা যাবে যে তাদের মাত্র ৩৫ শতাংশ স্থানীয় লোক, বাকিরা সবাই এসেছে বাইরে থেকে—পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর…

প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা ছাড়াও কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তিরুপুরের পার্শ্ববর্তী ইরোড, সালেম ইত্যাদি আরও অনেক এলাকা থেকে। অমিতদের অফিসের হেড অফিস কলকাতায়। এই সূত্রে বেশ কয়েকজন বাঙালি এই কারখানায় আছেন। তবে প্রোডাকশন সুপারভাইজার ও কর্মীরা অধিকাংশই তামিল। ফলে ভাষা এখানে একটা সমস্যা। অমিত এখানে এসেছে সাত মাস আগে, সরকারবাবু অবশ্য প্রায় দু’বছর হতে চলল এখানে আছেন। কিছু কিছু তামিল শব্দ ওরা শিখেছেন ঠিকই, বাকিটা আকারে-ইঙ্গিতে বা হিন্দি/ইংরেজি জানা কিছু সহকর্মীর সহযোগিতায় ওদের কাজ চালিয়ে নিতে হয়। দোকানে ঢুকে ‘রেণ্ডে কফি’ বলে দুজনে কফি খাওয়া বা ‘মুন চায়ে’ বলে তিনজনে চা খাওয়ার অভ্যাসটা অবশ্য ওদের হয়ে গেছে।

এইভাবে গ্যাটিস মেরে চলছে কাজ। যাই হোক, এই লোকটাকে টাকা দেওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। ম্যানেজার চ্যাটার্জী স্যারের চেম্বারের দিকে এগোয় অমিত। চ্যাটার্জী স্যারের বয়স হয়েছে, রাশভারী লোক, বছর খানেক আগে নাকে একটা ছোট অপারেশন হয়েছিল, তারপর থেকে ওনার কিছু কিছু উচ্চারণে চন্দ্রবিন্দুর প্রভাব থাকে। স্যারের ঘরে ঢোকে অমিত, সাথে সরকারবাবুও ঢোকেন ঘরে। তামিল লেবারটি ঘরের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের দিকে তাকাতে গিয়ে প্রথমেই ওই তামিল লেবারটির দিকে চোখ পড়ে যায় চ্যাটার্জী স্যারের।

'ওঁ ওঁখানে কেন দাঁড়িয়ে আছে?' অমিতকে জিজ্ঞেস করেন স্যার।

'স্যার, ও কিছু টাকা চাইছে। দেশে যাবে। সম্পত তো নেই আজ। তাই আপনি যদি পারমিশন দেন তাহলে সম্পতের অন অ্যাকাউন্ট টাকাটা ওকে দিতে পারি। ওর খুব দরকার বলছে।'

'কেন ওঁ টাকা চাইছে কেন? কী এমন দরকার?'

'আমি মূর্তিকে দিয়ে কারণ জেনেছি ওর কাছ থেকে। মূর্তি বলল ওর বিয়ে, তাই ও টাকা চাইছে।'

'বিয়ে, ওঁর বিয়ে? কত টাকা চাইছে?'

'পাঁচশ টাকা।'

'মাত্র পাঁচশ টাকা চাইছে বিয়ে করার জন্য! দিয়ে দাও, দিয়ে দাও। সম্পতের অন অ্যাকাউন্ট ওঁকে পাঁচশ টাকা দিয়ে দাও।'

ব্যস, বসের অর্ডার হয়ে গেছে, এখন আর টাকা দিতে কোনো অসুবিধা নেই। তবু কেন যেন মনটা খচখচ করতে থাকে অমিতের। বিয়ে করতে যাবে, মাত্র পাঁচশ টাকা চাইছে! চ্যাটার্জী স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের কিউবিকলে আসার পথে ও দেখতে পায় ওদের প্রোডাকশন সুপারভাইজার নাগরাজনকে। ছেলেটার বয়স ত্রিশের মধ্যে, বিয়ে হয়নি এখনও, খুব হাসিখুশি। ওকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে আসে।

'এই নাগরাজন,' বলে অমিত, 'হোয়াট ইউ আর ডুইং? ইউ ক্যান নট ম্যারি ওয়ানস। লুক অ্যাট দিস ফেলো। অ্যাট দিস এইজ হি ইজ গোয়িং টু গেট ম্যারেড।'

'ইয়াও স্যার, হি ইজ গোয়িং টু ম্যারি?' নাগরাজন বিস্মিত গলায় বলে।

তারপর ও কিছু কথা বলে লেবারটির সাথে তামিলে। তারপর হাসতে হাসতে অমিতকে বলে, 'নো নো স্যার। নট হিজ ম্যারেজ, হিজ কাজিন সিস্টার্স ম্যারেজ টুমরো। গোয়িং টু উর। দ্যাটস হোয়াই হি নিডস মানি।'

'নট হিজ ম্যারেজ! আর ইউ সিওর?'

'সিওর স্যার, হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিওর,' নাগরাজন জোর দিয়ে বলে।

তাহলে টাকাটা? টাকাটা তো স্যাংশন হল ওর বিয়ের জন্য। এখন তো বোঝা যাচ্ছে যে বিয়েটা ওর না। তবে? সরকারবাবুর দিকে তাকায় অমিত। এই মানুষটি সব ঘটনার সাক্ষী। এই অবস্থায় যদি এখন অমিত টাকাটা দিয়ে দেয়, এই ভদ্রলোক যে পরে চ্যাটার্জী স্যারের কাছে গিয়ে ওর নামে চুকলি কাটবেন না তার কী গ্যারান্টি আছে।

'কী করা যায় বলুন তো? এই পরিস্থিতিতে ওকে টাকাটা দেওয়া কি ঠিক হবে?' সরকারবাবুকে প্রশ্ন করে অমিত।

'ছাড়েন তো মশাই, এত ভাবছেন কেন? টাকাটা তো স্যার স্যাংশন করেই দিয়েছেন। গরিব লোক, দেশে যাচ্ছে একটা অনুষ্ঠানে আনন্দ করতে—কিছু টাকা হাতে নিয়ে যেতে দিন না।'

'যাক, আপনার কোনো আপত্তি নেই তাহলে,' বলে অমিত।

'না না, দিয়ে দিন।'

যাক, এরপর আর চুকলি কাটতে পারবে না। ক্যাশ থেকে টাকা বার করে ভাউচার লিখে লোকটিকে ডাকে অমিত, 'আন্না, কাম, টেক ইউর পেমেন্ট।' ভাউচারে সই করে হাতে টাকা নেয় লোকটি, মুখে তখন তার হাসি আর ধরে না।

.    .    .

Discus