ধপ করে একটা শব্দ যেন হল পাশের ঘরে। কিছু পড়ে গেল নাকি? আচমকা শব্দে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল রবির, বিছানায় সে উঠে বসে। পাশের ঘরের দরজা খোলার আওয়াজ পায়। কী ব্যাপার? দেখি তো? বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে রবি, ওর ঘরের দরজার পর্দা সরিয়ে বের হতে গিয়ে কিছু একটা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে দোরগোড়ায়। সামনের করিডোরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ওপাশে রান্নাঘরের লাইটটা জ্বলছে, তার হালকা আলোয় একটা শরীরের ছায়া চোখে পড়ে ওর। কে? লিপি? স্থির হয়ে পর্দার পিছনে দাঁড়িয়ে বাইরে চোখ লাগিয়ে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে রবি। সচল হয় ছায়াটা, রান্নাঘরের দিকে যায়। হ্যাঁ, লিপিই, আলো সরাসরি এখন গায়ে পড়ছে, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে চেহারা। নাইটি পরা, চুল অবিন্যস্ত - এই রকম অবস্থায় ওকে আগে কখনও দেখেনি রবি।
'লিঃ... ই... ই... পিঃ... ই... ই...' একটা চাপা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর নিঃশব্দ পরিবেশকে খান খান করে পাশের ঘরের মধ্যে থেকে বের হয়ে আসে। শিউরে ওঠে রবি, এ যেন কোনও ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘের চাপা গর্জন। একি বীভৎস কণ্ঠস্বর হালদার স্যারের। ফ্রিজটা খোলা ও বন্ধের আওয়াজ হয়। রান্নাঘরের আলোটা নিভে যায়। লিপির ছায়ামূর্তিটা ঢুকে পড়ে ওই ঘরে। দরাম করে দরজা বন্ধ করার শব্দ হয়।
রাত এখন দুটো প্রায়। অন্ধকার ঘরের বিছানায় শুয়ে নিজের অশান্ত মনকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে রবি। মাথার শিরাটা কেমন দপ দপ করছে, সারা শরীরে একটা অস্বস্তি। নানা ধরনের চিন্তার প্রবাহ মগজের মধ্যে গিজগিজ করছে। একবার মনে ভেসে উঠছে হালদার স্যারের মুখ, আবার তার পাশেই জেগে উঠছে লিপির মুখ। বিগত প্রায় তিন মাস লিপির সাথে একসাথে কাজ করছে রবি, বয়সে লিপি তার থেকে বেশ খানিকটা ছোট হলেও স্মার্ট, হিন্দি - ইংরেজি দুই ভাষায় সমান স্বচ্ছন্দ এই মেয়েটি তার মিষ্টি ব্যবহারে কারখানার সব কর্মীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। লিপির বাড়ি বর্ধমানে হলেও ওর বাবার চাকরিসূত্রে ওরা অনেকদিন থেকেছে এলাহাবাদে। সেখানেই লিপির বেড়ে ওঠা, শিক্ষাদীক্ষা। একটা পশ্চিমী লাবণ্য তাই ফুটে আছে ওর চেহারায়, যা সহজেই লোকের চোখে পড়ে। অফিসিয়ালি লিপি রবির বস, ওদের কোম্পানির এই ইউনিটের মার্কেটিংয়ের দিকটা ওই দেখে। তাছাড়া কোম্পানির এমডি হালদার স্যারের কাছে লিপিই এই ইউনিট নিয়ে যা রিপোর্ট করার তা করে। লিপি কিন্তু সব সময় রবিকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েই কথা বলে, প্রয়োজন পড়লে ওর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। দুজনের মধ্যে বেশ একটা বোঝাপড়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই ক' মাসের মধ্যে। আজকের এই অভিজ্ঞতা সেই মেয়েটির সম্পর্কে এই ক' মাসে যে একটা সহজ সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তাতে একটা প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল। রবির বয়স তো কম নয়, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে একাধিক জায়গায় কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। লকডাউনের বাজারে আগের চাকরিটা চলে যাওয়ার পর বাধ্য হয়েই বউ - বাচ্চাদের ফেলে কলকাতা থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরে এই ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল সে। এই কোম্পানির হেড অফিস কলকাতায়, সাত মাস আগে ওখানেই জয়েন করেছিল রবি, ভেবেছিল সেখানেই সে কাজ করবে। কিন্তু এমডি স্যার মিস্টার হালদার কিছু বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে রবিকে তিন মাস আগে এই ফ্যাক্টরিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনিচ্ছা থাকলেও রবির পক্ষে সম্ভব হয়নি জীবিকার প্রয়োজনে এই দায়িত্বটা অস্বীকার করার। এই বয়সে কলকাতায় একটা নতুন চাকরি খোঁজা যে প্রায় একটা অসম্ভব ব্যাপার সেটা তার চেয়ে বেশি আর কে জানে।
ওঃ, একটু মাথায়, চোখে মুখে জল দিতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তাহলে তো ঘরের বাইরে যেতে হয়। না, না, সেটা এখন অসম্ভব। আবার যদি কোনও একটা দৃশ্য দেখে অপ্রস্তুত হতে হয়! ওর এই পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে এরকম অভিজ্ঞতা তার আগে কখনও হয়নি। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রবি, মফস্বল শহরের শান্ত পরিবেশে ছোট থেকে মানুষ। ও সেই পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে ওরা কোনও মায়ের বয়সী মহিলাকে কাকিমা বা মাসিমা বলে সম্বোধন করে উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে কথা বলতে শিখেছে, বয়সে কিছুটা বড় মেয়েকে দিদি বলে ডেকে উপযুক্ত সম্মান দিয়েছে, সমবয়সী বা বয়সে ছোট মেয়েদের শিখেছে বন্ধু বা বোনের স্নেহ ও ভালোবাসা জানাতে। নারী - পুরুষের সম্পর্কের সুস্থ, স্বাভাবিক রূপটাই দেখেছে এতদিন। রবি জানে সংসারে শুধু আলো না, আছে অন্ধকারও, আছে নারী - পুরুষ সম্পর্কের নানা কদর্য রূপ। এতদিন এই ব্যাপারগুলি তার কাছে গল্পের বই, খবরের কাগজ বা টিভি সিরিয়ালের টুকরো অংশ হিসেবে জানা ছিল, আজ তা বাস্তবে উপলব্ধি করল। কানাঘুষোয় এই রকম একটা অবস্থার খবর আভাসে ইঙ্গিতে তার কানে যে পৌঁছায়নি তা কিন্তু নয়, তবে এতটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। এখন বুঝতে পারছে কেন রাজীবদা দু' দিন আগে পনেরো দিনের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার সময় বলছিলেন, 'পরশু হালদার স্যার এখানে আসছেন। তুমি তো ওনাকে আগে কখনও এখানে মিট করো নি। যদি উনি রাত্রিবেলা এবার গেস্ট হাউসে থেকে যান তবে ভুল করেও রাত্রিবেলা শুতে যাওয়ার পর ঘরের বাইরে বের হবে না। দরজা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে থাকবে।' অভিজ্ঞ লোকের উপদেশের গভীরতা তখন রবি ধরতে পারেনি, এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। ওর ছোটবয়স থেকে শেখা শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ চাইছে এর প্রতিবাদ করতে, বাস্তব বুদ্ধি বলছে চুপ করে থাকতে, ঘটনাটা ভুলে যেতে। তার নিজের তো এতে কিছু এসে যাচ্ছে না। সে এখানে এসেছে চাকরি করতে - কলকাতার চেনা পরিবেশ, আত্মীয় পরিজন থেকে এত দূরে। তার পরিবারের প্রতিপালন, তাদের নানা আশা আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ উন্নতি - এসবের প্রতি তার মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্যসব কিছু ভুলে যাওয়া উচিত। লিপি তার কে? তিন মাস আগে এই ফ্যাক্টরিতে আসার আগে ওকে তো চিনতই না রবি। তাহলে তার ব্যাপারে এত ভাবার দায় তার কিসের?
এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রবি, পরদিন সকালে ওর ঘুম ভাঙল কলিং বেলের আওয়াজে। সাতটা বেজে গেছে, তার মানে নাগেশ্বর এসে গেছে। নাগেশ্বর ওদের গেস্ট হাউসের কুক কাম কাজের লোক, গেস্ট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণ, ওদের খাওয়া - সবকিছুর দায়িত্ব তার। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সদর দরজাটা খুলে দেয় রবি।
'উঠনে মে আজ থোড়া দের হো গিয়া স্যার, হ্যায় না?' নাগেশ্বর ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে।
একটু হেসে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যায় রবি। নাগেশ্বরের হাত আর মুখ একই সঙ্গে চলে, বলে, 'এমডি স্যার হ্যায় না, রাত মে বহুত দের তক জাগতা হ্যায়। সুবহ দেরসে উঠতা হ্যায়। দেখো, আজ লিপিদিদি ভি দেরসে উঠেঙ্গি। মেরা হি মুসিবত। বাজার জানা পড়েগা। শেঠকা লিয়ে স্পেশাল মাছ লে আনা পড়েগা। আপ জলদি না - ধোকে রেডি হো জাইয়ে স্যার। আপ কো চা - নাস্তা দেকে হাম নিকল যায়েগা বাজার।'
এইসব সময় এদের প্ল্যানিং মেনে চলাটাই সেফ। রবি তাড়াতাড়ি স্নান করে অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নেয়। পাশের ঘরের দরজা এখনও বন্ধ। নাগেশ্বর তাকে জলখাবার দিয়ে দেয়। ওর খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই ওদের কোম্পানির ড্রাইভার সন্তোষ এসে হাজির গেস্ট হাউসে। নাগেশ্বরও ততক্ষণে বাজারের ব্যাগ নিয়ে রেডি। তিনজনেই একসাথে গেস্ট হাউস থেকে বের হয়। নাগেশ্বরের কাছে গেস্ট হাউসের দরজার চাবি, সে আর সন্তোষ বাইকে উঠে পড়ে বাজারে যাওয়ার জন্য, রবি রওনা দেয় ওর অফিসের দিকে।