Source: Akshat Jhingran on Unsplash.com

বুবলাই বড্ড মনকষ্টে আছে ছোটো থেকে। বাবা-মা সেই কোন ছোটোবেলায় আলাদা হয়ে গেছে। ও নিজে কিছুটা একা একাই বড়ো হয়েছে। সাত বছর বয়সে বাবা-মা আলাদা হয়ে গেল। বিশ্বম্ভর ও সুজাতা ওর বাবা, মা। সুজাতার বাবা-মা এই আলাদা হওয়া খুব একটা পছন্দ করেননি। সুজাতার এই ডিসিশনকে সুজাতার সুরেন রায় এবং কাবেরী রায় পছন্দ করেননি। মা সুজাতা একেবারেই মানাতে পারছিল না তার বাবা এবং শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে। ফলে আলাদা হয়ে চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। বাবা বিশ্বম্ভর খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ। কলেজে পড়ায়। বিষয় সোসিওলজি। পড়ানো এবং লেখাপড়া নিয়ে মানুষটা খুব ডুবে থাকে। এই রকম একজন বাবা পাওয়ার ফলে বুবলাই কখনো খুব উচ্চকিত স্বভাবের মানুষ তৈরি হয়নি। খুব সংযত, স্থির এবং সবার সাথে মানিয়ে চলার মানসিকতা বাবার সান্নিধ্যেই তৈরি হয়েছে। বুবলাইয়ের মা, সুজাতা ছিল উচ্চকিত স্বভাবের। সবসময় হৈ হৈ করা পছন্দ করত। বাইরে রেস্টুরেন্টের খাওয়া দাওয়া পছন্দ করত। সাজগোজ, হা হা করে হাসি, কোথাও ঝটপট বেড়াতে যাওয়া, অনুষ্ঠান উপভোগ করা এগুলো ছিল সুজাতার স্বভাবজাত। ফলে সুজাতা ঘরকন্নার কাজ খুব একটা পারত না। তার নজরটাই ছিল হৈ হৈ করে বাঁচার দিকে। সবকিছু ধারণ করে এবং সঙ্গে নিয়ে চলত বিশ্বম্ভর কিন্তু সঙ্গে ছিলেন বিশ্বম্ভরের বাবা-মা জিতেন্দ্রনাথ এবং সুমিতা মজুমদার। তাঁরা একটুখানি পুরোনো স্বভাবের। ফলে বাড়ির বউ সব সময় হুল্লোড় করে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা তাঁদের সবসময় পছন্দ হতো না। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও তাঁরা এত বাইরের খাবার খাওয়া পছন্দ করতেন না। এই নিয়ে প্রথম প্রথম টানাপোড়েন, তারপরে সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে বিশ্বম্ভর আর সুজাতার মধ্যে এটা বিরাট দূরত্বের সৃষ্টি হয়ে গেল। সুজাতা বুঝতে পারল যে তার এই হৈ হৈ করে বাঁচা এরা ঠিক অভ্যস্ত হতে পারছেন না এবং সেও খুব ঘরোয়া একটা পরিবেশ সহ্য করতে পারছে না। তখন বুদ্ধিমতী সুজাতা ঠিক করল এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সুজাতা একটু হুড়মুড় করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যস্ত হওয়ায় সে সিদ্ধান্ত নিল যে সে আলাদা থাকবে। আলাদা হয়ে যাবে বিশ্বম্ভরের থেকে। যদিও ছেলে আছে কিন্তু সেটাও তাকে আর সেইভাবে টানল না ঘরমুখো করবার জন্য। সুজাতা বেরিয়ে পড়ল সংসার ছেড়ে এবং ছেলের দায়িত্ব দিয়ে গেল বিশ্বম্ভরকে। ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষ বিশ্বম্ভর বুঝতে পারল যে সুজাতাকে এই পরিস্থিতিতে জোর করে আটকে রাখতে গেলে তিক্ততা বাড়বে এবং সুজাতা নিজস্ব প্রাণশক্তি হারিয়ে গিয়ে সে একটা জড় পদার্থে পরিণত হবে। তার থেকে ভালো সুজাতা আলাদাই থাকুক এবং তার নিজের জীবনের পথ নিজেই চলুক। সব দায়িত্ব স্বীকার করে নিল। ছেলে এবং কিছুটা সুজাতার বাবা-মার ক্ষেত্রেও।

সুজাতার বাবা-মাও সুজাতার এই সিদ্ধান্তকে খুব একটা সমর্থন করে উঠতে পারলেন না। তাঁরা তাঁদের মেয়ের সীমাবদ্ধতাটা বুঝতেন। ফলে তাঁরা জানতেন যে এই যে বনিবনার অভাব এটার কারণ তাঁদের মেয়ের মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতার অভাবের জন্য। অন্য কোন কিছু করতে না পারলেও সুজাতার বিচ্ছেদের পরেও তাঁরা যোগাযোগ রেখেছিলেন। বুবলাই তাঁদের নাতি হওয়ার কারণে যথেষ্ট তাঁদের স্নেহের পরশ পেয়েছে। এদিকে সুজাতা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরে মিউচুয়াল ডিভোর্স করে এবং আর কোনো বিয়ে বা সম্পর্কে না জড়িয়ে নিজের কাজেই মনোযোগী হয়ে পড়ে। সে কাজটা করতে করতে একটা অসম্ভব পারদর্শিতার জায়গায় গিয়ে পৌঁছয়। অনেকগুলো বিদেশি ভাষা জানার ফলে সে স্প্যানিশে একটি বিশেষ পারদর্শী মানুষের মর্যাদা পায়। বহু ক্ষেত্রে সে বিদেশে সাহিত্য এবং নানা রকম লেখাপত্রে তার অবদান রাখতে শুরু করে। ফলে তার জীবনের কাজের একটা অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় বিদেশের বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো। এই করতে করতে একসময় দেশটা তার কাছে অনেকখানি দূরে চলে যায়। তারপরে একটা সময় সুজাতা ঠিক করে কোথাও একটা স্থায়ী কাজ করতে হবে। সেই জায়গাটা যেহেতু বিদেশেই হবে, কারণ সে বিদেশি ভাষা নিয়ে কাজ করে। সুইজারল্যান্ডে কাজের সুযোগ থাকায় সেখানে থাকা তার কাছে সহজ হয়ে যায় এবং সেখানে সে একটি ইউনিভার্সিটিতে বিভিন্ন অনুবাদ এবং এডিট সম্পাদনার কাজে যোগ দেয়।

এদিকে বিশ্বম্ভরও অধ্যাপনা করত। সে একটি স্থির ব্যক্তি হওয়ার ফলে ছেলেকে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে রেখে পড়াশোনা করায় এবং বুবলাই পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। ক্রমাগত সে ভালো ভালো রেজাল্ট করতে করতে একসময় বিদেশে পড়ার সুযোগ পায়। সেখানে লেখাপড়ার শেষে চাকরিও পেয়ে যায়। এদিকে বিশ্বম্ভরের বাবা-মাও ততদিনে গত হয়েছেন। সুজাতার বাবা-মাও নেই। ফলে আগের সিঁড়ির কেউই আর তখন নেই। এই সময় বিশ্বম্ভর ঠিক করে সে একটা এনজিওতে ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য যুক্ত হবে। সেই জায়গাটা খুঁজে বার করে দার্জিলিং-এর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে বাচ্চারা খুব কষ্টে থাকে। এই ঠান্ডার মধ্যে ঠিকমতো পরিচর্যা, পরিবেশ পায় না। অভাবটা সাংঘাতিক। বাবা-মায়ের রোজগারের রাস্তাটাও খুব সীমিত। সেখানে সে একটা এনজিওর স্কুলে ছোট বাচ্চাদেরকে ক্লাস ফাইভ থেকে পড়ানোর একটি প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়, এবং তার অধ্যাপনার কাছ থেকে সে অব্যাহতি নেয় সময়ের আগে।

ফলে বিশ্বম্ভর এক জায়গায়, সুজাতা আরেক জায়গায়। বুবলাই অর্থাৎ অনিকেত সে থাকে আফ্রিকাতে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে যার মতো নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ভিডিও কলে অনেক সময় কথাবার্তা হয়। এর প্রধান উদ্যোগটাই কিন্তু বিশ্বম্ভরের। অসম্ভব স্নেহপ্রবণ একটা জীবনবোধ থেকে সে বুবলাই এবং সুজাতা দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখে। মা-বাবা বারবার পাওয়া যায় না এবং এটা কোনো সন্তান স্থিরও করতে পারে না যে তার বাবা-মা কে হবে। সুতরাং পূর্বনির্ধারিতভাবেই বাবা এবং মাকে মেনে নিতে হয়। হ্যাঁ পিতৃসম, মাতৃসম কেউ হতে পারেন জীবনে, কিন্তু বাবা-মা-এর কোনো বিকল্প হয় না। এটা বুবলাইকে যদিও সে একাই মানুষ করেছে তবু খুব সহজ করে সুন্দর করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বুবলাই মা ছাড়া বড়ো হলেও কারোর প্রতি কোনো বিরুদ্ধ মনোভাব কখনোই পোষণ করেনি। এছাড়া বুবলাই নিজেও খুব সহজ এবং দরদী মনের ছেলে। ফলে তার সঙ্গে তার মায়ের একটা যোগাযোগ বরাবর ছোটো থেকেই রয়ে গেছে। বুবলাই সেই অর্থে মায়ের বিরুদ্ধে কখনো যায়নি, সবাইকে খুব কাছে থেকে পেয়েছে। ঠাকুমা, দাদাই, দিদা, মামাবাড়ির দাদু সবাইকে খুব প্রাণের কাছাকাছি অনুভব করতে পেরেছে। ফলে বুবলাই একটা নরম অথচ দৃঢ় মনোভাবের ব্যক্তিত্ব লাভ করেছে।

এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ২৫টা বছর। সুজাতাও অনেক এগিয়ে গেছে সঙ্গে বিশ্বম্ভরেরও বয়স হয়েছে। বুবলাই একটা পরিপূর্ণ যুবক। সামনেই বুবলাইয়ের বিয়ে। নিজের পছন্দেই বিয়ে করছে। পাত্রীর নাম পারমিতা। পারমিতার বাড়ি ভবানীপুরে। পারমিতার বাবা-মা বুবলাইকে দেখে একেবারে মুগ্ধ। একটি বিচ্ছিন্ন পরিবারের ছেলে এত ভালো এবং সহজ হতে পারে সেটা এরা ভাবতেই পারেননি। কিন্তু বুবলাইকে দেখার পরে তাঁদের ভুল ভেঙে যায়। তাঁরা বিশ্বম্ভরের সঙ্গে এবং সুজাতার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। তারপরে বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়েতে খুব আড়ম্বর কিছু হয় না, কিন্তু আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্ত কিছুর আয়োজন করা হয়। একটাই অভাব থেকে যায়, সুজাতার আসা হয় না। কারণ সেই সময় সুজাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন চলায় সুজাতা ছুটির ব্যবস্থা করতে পারে না। বউকে নিয়ে আফ্রিকায় চলে যায় বুবলাই। সেখানে পারমিতা একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি পায় এবং বুবলাই নাইজেরিয়ায় অর্থনৈতিক উপদেষ্টার কাজ করতে থাকে। এই করতে করতে চলে যায় আরো কটা বছর।

ততদিনে সুজাতা এবং বিশ্বম্ভর দুজনেই ষাটের কোটা পার হয়ে সত্তরের দিকে রওনা দিয়েছে। সুজাতা তখনো ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে এবং বিশ্বম্ভর সেই এনজিওতে দার্জিলিং-এই আছে। বুবলাই মাঝে মাঝে কলকাতায় আসলে বাবার সঙ্গে দেখা হয়। তা না হলে সবাই ওই ভিডিও কলে কথা বলে। বুবলাই সুইজারল্যান্ডে মার কাছে গিয়েছিল এবং মার সঙ্গে দেখা করেও এসেছে। সুজাতা ছেলেকে এবং তার বৌমাকে দেখে অত্যন্ত খুশি হয়েছিল। ভাবতেই পারেনি যে পারমিতা এত আপন করে নেবে সুজাতাকে। দুজনের জন্য একটা ট্রিপের ব্যবস্থা করেছিল সুজাতা আমেরিকাতে, সঙ্গেও গিয়েছিল।

এই করতে করতে বছরটা এসে পৌঁছালো ২০২৫-এর গোড়ায়। একদিন বুবলাই বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলল। বলল বাবা আমাদের শ্যামবাজারে যে বাড়িটা আছে সেই বাড়িটা নিয়ে তুমি কিছু ভেবেছ? কিছু ভাবিনি রে বাবু। কারণ ওই বাড়িটা তো শুধু আমার নয়, আমার পিসিরও একটা ভাগ আছে। তাই এখন তুই কী বলতে চাইছিস সেটা বল। তখন বুবলাই বলল- শোনো বাবা পিসিঠাম্মার ভাগের টাকাটা যদি পিসিঠাম্মা তো নেই তাঁর ছেলেদেরকে মিটিয়ে দেওয়া হয় তাহলে বাড়িটা তো আমাদের একার হয়ে যাবে। কারণ তোমার কোনো ভাইবোন নেই। বিশ্বম্ভর বলে সেটা তো ঠিকই কথা এখন এই কাজটা কে করবে? ওদেরকে বোঝাবে কে? ওরা ছাড়তে রাজি হবে কিনা এসব তো একটা জটিলতা আছে। বুবলাই বলে আমার উকিল আছে। টাকা-পয়সা ওরা যা চাইবে বাজারদরে সেই হিসেবে মিটিয়ে দেওয়া যাবে। আগে আমরা আমাদের নিজেদের নামে পুরো বাড়িটাকে করি তারপরে অন্য কথা ভাবব। বিশ্বম্ভর বলে তোর কী দরকার? তুই এসব কথা ভাবছিসই বা কেন? তুই আছিস এক দেশে, আমি এক দেশে, তোর মা আর এক দেশে। এই বাড়িঘর নিয়ে কী করবি? কোন কাজে লাগবে এত বড়ো বাড়ি? শ্যামবাজারের পাঁচতলা বাড়িতে আবার ভাড়াটেরাও আছে। তখনই বুবলাই বলল তুমি আমার উপরে সব ছেড়ে দাও। যা করবার আমি করব। তুমি রাজি কিনা সেটা বলো। তাহলে আমি সেইভাবে কাকুদের সঙ্গে কথা বলব। তুমি শুধু আমাকে অনুমতি দাও। বিশ্বম্ভর তখন বলল ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস কর। আমাকে মাঝে মাঝে জানাস যদি কোনো গন্ডগোল হয়। আমি তাহলে রন্টুর সঙ্গে কথা বলব। রন্টু হল বিশ্বম্ভরের পিসতুতো ভাই। বুবলাই বলল ঠিক আছে আমি দেখি কথা বলে, তারপর তোমাকে জানাব।

কিছুদিন বাদে বুবলাই আবার ফোন করল বাবাকে। বলল বাবা আমি রন্টু কাকু, মন্টু কাকু দুজনের সঙ্গেই কথা বলেছি। ওদেরও বয়স হয়ে গেছে তো, এখন একটা কিছু সেটেল করলে ওদের কোনো আপত্তি নেই। ওরা বাজারদরে আমাদের কাছ থেকে এই ব্যাপারটার জন্য দু কোটি টাকা চেয়েছে। ওটা আমার কাছে কোনো ব্যাপার নয়। আমি ওই টাকাটা মিটিয়ে দেবো। তুমি এই টাকা নিয়ে চিন্তা করো না। বিশ্বম্ভর বলে যে দু কোটি টাকা তুই একা কোথা থেকে দিবি তুই কোথা থেকে এত টাকা অ্যারেঞ্জ করতে পারবি? অসুবিধা হবে না? আমার থেকে তাহলে কিছু টাকা নে। বুবলাই বলল না বাবা তোমার টাকাটা থাক। পরে দরকারে লাগবে। আমার এখন ওই টাকার কোনো দরকার নেই। আগে আমি রন্টু কাকু, মন্টু কাকুর সঙ্গে সব জিনিসটা ঠিকঠাক করি। উকিলবাবুকে বলেছি, ওদেরকেও বলেছি যে উকিল সবকিছু করবে যেহেতু আমি বিদেশে থাকি। সব জিনিসটা মিটে যাবে। তা ভালো অসুবিধা হলে আমাকে জানাস। আমি তখন যা সাহায্য করার করব।

ছয় মাস কেটে গেল পুরো জিনিসটা আইনিভাবে সমাধান করতে। বুবলাই তার রন্টু কাকা, মন্টু কাকাকে পুরো টাকা মিটিয়ে দিল তার উকিলের মাধ্যমে। এরপরে বাড়িটাকে নতুন করে তৈরি করবার জন্য ভাড়াটেদের সঙ্গেও উকিলবাবু কথাবার্তা বলে ব্যবস্থা করলেন। পুরো বাড়িটার বাইরের স্ট্রাকচারটা একই রকম রেখে ভেতরটা বদলে দেওয়া হল। ভাড়াটেরা একটা করে ফ্ল্যাট এবং বাড়িটাকে ৭ তলা করা হল।

এরপর বুবলাই আবার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করল। বিশ্বম্ভর বলল কী ব্যাপার, কী করলি? বুবলাই বলল যে সব হয়ে গেছে। রন্টু কাকুদের টাকাও মেটানো হয়ে গেছে। বাড়িটার ভাড়াটেদের সঙ্গেও ডিল হয়ে গেছে। ওই বাড়িটা সাততলা হবে, বাইরেটা ঠিক একই রকম রেখে ভেতরটা পাল্টে দেওয়া হবে এবং ভাড়াটেরা দুতলায় একটা করে ফ্ল্যাট পাবে। আর তিনতলা থেকে আমাদের থাকবে। বিশ্বম্ভর বলে তুই এত টাকা খরচা করে এই যে বাড়িটাকে এরকমভাবে নতুনভাবে তৈরি করছিস, এত বড়ো বাড়ি নিয়ে কী করবি? তুই থাকিস এক জায়গায়, আমি থাকি এখানে। কে দেখবে এত বড়ো বাড়ি আর ভোগই বা করবে কে? বুবলাই হেসে বলল আছে আছে ভোগ করার লোকও আছে, আমার মাথায় অনেক প্ল্যানও আছে। আমি এবার কিছুদিনের মধ্যেই দেশে যাব তখন তুমি কলকাতায় আসবে তোমার সাথে বসে সব কথা হবে। তারপর তুমি জানতে পারবে। এখন বলা যাবে না। কী এমন কথা রে তুই এখন ফোনে বলতে পারছিস না পরে বলবি? হ্যাঁ পরেই বলব, তার কারণ আছে। আমি আগে দেশে যাই তারপরে তোমার সাথে কথা বলব। আমি যখন বলব তখন তুমি কলকাতা চলে আসবে কিন্তু। এটা মনে রেখো। বলে ফোনটা কেটে দিল।

আরো ছয় মাস বাদে হঠাৎ বুবলাই একদিন ফোন করল। বিশ্বম্ভরকে বলল বাবা তুমি কলকাতায় এসো। দরকার আছে। সব জানাব। তোমার সাথে ফোনে কথা বলে হবে না। আর বাবা বলছি তো তুমি চলে এসো একেবারে। সব ছেড়ে। জরুরি ব্যাপার। এখন রাখছি, পরে কথা হবে। তুমি কলকাতায় আসলে কথা হবে। বিশ্বম্ভর যথারীতি ছেলের কথা শুনে ইনস্টিটিউট থেকে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় আসল দিন দশেক বাদে। এসে উঠল একটি গেস্ট হাউসে। ছেলেকে খবর দিল। ছেলে কলকাতায় আছে। অন্য একটি গেস্ট হাউস। ছেলে বলল বাবা আজ বিকেলে আমরা তোমার গেস্ট হাউসে যাচ্ছি আমার সঙ্গে একজন থাকবে কথা আছে। কে আসবে? আরে গেলেই দেখতে পাবে কে আসছে। বিশ্বম্ভর বলল ঠিক আছে। বিকেলবেলা বুবলাই আসল। সঙ্গে পারমিতা। আরও একজন আছে। সুজাতা। এত বছর বাদেও সুজাতাকে চিনতে বিশ্বম্ভরের ভুল হল না। সুজাতাও খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। আসলে বুবলাই বাবা, মা দুজনের কাউকেই অন্যজনের কথা বলেনি।

একটু পরে সবাই একটা স্বাভাবিক অবস্থায় আসল। ইতিমধ্যে চা এবং স্ন্যাকস খাওয়া হয়ে গেছে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বিশ্বম্ভর এবং সুজাতা দুজনে অনেক সহজভাবে কথা বলছে। পারমিতা তখন বলল তোমরা দুজনে একটা কথা শোনো। আমি এবং অনিকেত দুজনে ঠিক করে এই বাড়িতে দোতলায় ভাড়াটেদের ওনারশিপ ফ্ল্যাট দিয়েছি। চার এবং পাঁচতলায় বাচ্চাদের অনাথ আশ্রম করেছি। তিনতলায় অফিস করেছি। ছতলায় তোমাদের দুজনের দুটো আলাদা ফ্ল্যাট, এছাড়া আমাদের দুজনের আলাদা আরেকটা মোট তিনটে ফ্ল্যাট করেছি। আর সাততলায় বাচ্চাদের একটা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করেছি। সেখানে নানান extra curricular activities-এর ক্লাস হবে। সবকিছু গুছিয়ে কাজ দুমাস আগেই শুরু করেছি। কিছু বাচ্চা এসেছে। তোমরা দুজনে এই ইনস্টিটিউট-এর Senior Advisor, না করলে শুনব না। আর মামণি তোমার আর সুইজারল্যান্ড ফিরে যাওয়া হচ্ছে না। মেইল করে সবটা জানিয়ে দাও। না করলেও ছাড়ছি না। যেতে দেব না। এতক্ষণ বুবলাই কোনো কথা বলেনি। এবার বলল এতদিন তোমরা ভালো ছিলে না। আর আমি তো একদমই ভালো ছিলাম না। আমরা সবাই খুব কষ্টে ছিলাম। এখন সব ভুলে চলো সবাই একসাথে এই ছোটো বাচ্চাগুলোকে একটা আকাশ দিই। ওরা বড়ো অসহায়। আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি একমাস আগে। দাদাইয়ের সবাইকে নিয়ে বাঁচার ইচ্ছে ছিল। দাদাই বেঁধে বেঁধে থাকতে ভালোবাসত, তাই তো দাদাইয়ের নামে ইনস্টিটিউট-এর নাম দিয়েছি জিতেন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউট। চলো সবাই বেঁধে বেঁধে থাকি। বিশ্বম্ভর এবং সুজাতা অবাক হয়ে আত্মজের দিকে তাকিয়ে থাকল।

.    .    .

Discus