সায়ন বড়লোকের ছেলে। তায় আবার পড়াশোনায় বেজায় ভালো। প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হতে যেন সে ভুলেই গেছে। এক ক্লাসে আমাদের সাথে পড়লে কী হবে, সব সময়ই তার নিজস্ব আদব-কায়দায় নানান ভাবেই বুঝিয়ে দেয় যে সে সবার থেকে অনেকটাই আলাদা। স্কুলে কম কথা বলা সায়ন যেমন সবাইকে এড়িয়ে চলে, বাকি সবাইও তাকে বিশেষ একটা ঘাঁটায় না। ছুটির ঘণ্টা বাজলেই স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা এইয়্যা বড় চারচাকা গাড়িটাকে ঘিরে যেন উন্মাদনার শেষ থাকে না স্কুলে সদ্য ভর্তি হওয়া কচিকাঁচাদের। সায়নের মুখটাও দেখলে বেশ বোঝা যায়, সে বেশ তারিয়ে তারিয়ে তা উপভোগ করে। টিফিনের সময় সায়ন বড়জোর দ্বিতীয় কী তৃতীয় স্থানাধিকারীর সাথে অল্পই কথাবার্তা বলে। বাকি সময়টা শুধুই পড়াশোনা আর পড়াশোনা।
এহেন সায়ন মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে নজরকাড়া রেজাল্ট করার পর চলে গেল খড়গপুর আইআইটিতে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। তারপর সে-সব কমপ্লিট করে আলটিমেটলি উচ্চাকাঙ্ক্ষী সায়নকে খুব সঙ্গত কারণেই কেড়ে নিল আমাদের মহামান্য ইউ.এস.এ। মোটা টাকার বিনিময়ে।
একমাত্র ছেলে নাসায় কাজ করে বলে গর্বিত বাবা-মা’র মুখমণ্ডলের গর্ব-গর্ব উঁচু-নাক ভাবটা যেন ইদানীং গেছে আরও দ্বিগুণ বেড়ে। রাস্তাঘাটে যেখানেই তাঁদের সাথে দেখা হতো, প্রাথমিক আমার বা আমাদের কুশলাদি বিনিময়ের পরিবর্তে, ও’দেশে সায়নের বর্তমান বৈভবীয় অবস্থান জ্ঞাপনেই তাঁরা যেন বেশি আগ্রহী দেখাতেন।
প্রথম দিকটায় সায়ন বছরে একবার করে আসত। বেশ কিছু বছর পর থেকে দেখা গেল তিন, কখনও চার বছর পরপর সায়ন এ’দেশে আসে। তখন কখনও রাস্তায় দেখা হলে আড়চোখে চিনেও যেন না চেনার ভান করত সায়ন। বরং আমরা বেহায়ারা, নিজেরাই এগিয়ে যেতাম একটু বিদেশী-ছোঁয়া পাওয়ার জন্য। মাঝেসাঝে পকেট থেকে একটা-দুটো দেখতে বেশি কালো ও’দেশের ক্যাডবেরি চকোলেট বার করে দিয়ে বলত, “তোর ছেলেমেয়েদের এটা দিস।”
আমরাও ও’টুকু বিদেশী-প্রসাদ লইয়া যাহার পর আর নাই, এতটাই আনন্দিত এবং আল্হাদিত হইয়া উদবাহু নৃত্যে নাচিতে নাচিতে বাড়িতে ফিরিয়া যাইতাম। অতঃপর অম্লান-বদনে তাহা সোৎসাহে তথা উচ্চগ্রামে ছেলেমেয়েদিগকে বিতরণ করিয়া বাস্তবিকই যথেষ্ট পরিতৃপ্তি লাভ করিতাম। শুধু তাহাই নহে, আমাদের মতো তথা অবস্থানে থাকা বন্ধু-বান্ধবদের তাহা স্বদর্পে প্রকাশ করতঃ আক্ষরিক সন্তোষও লাভ করিতাম বটে। তদুপরি বন্ধুমহলে সায়ন কাহাকে কতটা তাহার মূল্যবান সময় উজাড় করিয়া দিল নিতান্তই সৌজন্য বিনিময়ের সৌজন্যে, তাহা পর্যন্ত ছিল রীতিমতো আলোচিত বিষয়।
আমি তখন ঠিক মাঝবয়সের দোরগোড়ায়। ইতিমধ্যেই সায়নের বাবা-মা দুজনেই গত হয়েছেন। নাহ্, সায়নের বাবা কিংবা মা কেউই তাঁদের শেষ সময়ে সায়নের হাতের জল পাননি। পাড়ার মানুষের সহযোগিতায় দুজনের সৎকার হয়। দু-বারই অফিসের কাজের চাপের জন্য সায়ন এদেশে আসতে পারেনি। অন্তত তখন তখন সায়নের পক্ষ থেকে সায়নের পাড়ার মানুষদের তাই-ই জানানো হয়। তাই পাড়ার লোকজনেরাই বাবা এবং মা’র ফটোর সামনে রেখে দু-বারই একটি স্মরণসভার আয়োজন করেন। এইভাবেই স্থানীয় মানুষজন তাঁদের উদ্দেশ্যে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
এরপর এমনি ভাবেই দিব্যি কেটে গেল আরও পাঁচ-পাঁচটি বছর। তালাবন্ধ সায়নদের বড় বাড়িটি এখন সম্পূর্ণরূপে জঙ্গলাবৃত। মরচে ধরা লোহার মেইন ফটকের দু’ধারে উল্লু, পিঁপড়েরা ইতিমধ্যেই নিশ্চিন্তে মাটি খুঁড়ে ছোটোখাটো মহেঞ্জোদারো বানিয়ে ফেলেছে। যেখান-সেখানে দেয়ালের ফাটল দিয়ে বট আর অশ্বত্থের অবারিত চলাচল দেখা যায়। দেখে মনে হয় যেন এরাও একসাথে এখনই ইতিহাসকে হাতে ছুঁয়ে একবার পরখ করে দেখতে চাইছে। চারিদিকের অজস্র ঝুল, মাকড়সাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে যেন নিজেরাই হাত লাগিয়েছে। ওদের বাড়ির সামনে আছে একটি ছোটো রাস্তা। সেই রাস্তাটা আবার ঘুরেফিরে মিশেছে একটি বড় রাস্তায়। সেই বড় রাস্তার ঠিক মোড়টায় আছে এক শতাব্দী-প্রাচীন বটগাছ। না না না, তার নীচে বাঁধানো কোনো বেদী-টেদী কিছুই নেই। তখনও ছিল না। আজও নেই। অসমান উঁচু-নীচু গুঁড়ির চারপাশটা অনেক আগেও ঠিক যেমন ছিল, এখনও ঠিক তেমনটিই আছে। কেমন যেন ভীষণ অগোছালো মতো। সায়নদের ওটা নিজের পাড়া হলে কী হবে, ভালো ছেলে সায়ন কিন্তু কোনোদিনই ওখানে বসে কখনোই আড্ডা মারেনি। কিন্তু আমরা ওখানে একটা সময় বসে, বেশ মজাসে বহুৎ আড্ডা মেরেছি।
আমার চলছে এখন পঞ্চাশোর্ধ জীবনের বিচিত্র এক টানাপোড়েনের সময়। দৌড়, দৌড় আর দৌড়। মোটে ফুরসৎ নেই তাকিয়ে দেখার আমার চারপাশ। রোজকার অফিস যাওয়া-আসার পথেই পড়ে সেই বিখ্যাত বটগাছতলা মোড়। কিন্তু তা হলেই বা কী হবে, এতদিনের অবহেলিত অকেজো স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার কথা এখন তো প্রায় ভুলতেই বসেছি। কেমন যেন আজ আর নজরেই আসে না। আসার তো কথাও অবশ্য নয়। এরকম তো চলতে ফিরতে ছোটোবেলার কত কিছুই আমাদের চারপাশে থেকেই থাকে। তাই-না! আবার কোথাও—বেশ কিছু পুরোনো চলে গিয়ে হয় নতুনের আগমন। এইরকম ধারাবাহিকতার আরেক নামই যে জীবন। এ’তে আর আশ্চর্যের কী আছে। আমি বা আমরা, ছোটোবেলা থেকেই ছিলাম যেমন ‘সাধারণ’, আজও তেমন কোনো ‘অসাধারণত্ব’ কিন্তু আমাদের জীবনে প্রবেশও করেনি। তাই পরিবেশগতভাবে একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাওয়ার কারণে তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এখন পর্যন্ত নজরেও আসেনি।
সেদিন বড় রাস্তা দিয়ে সাইকেল করে অফিস যাচ্ছি। রোজই যেমন যাই আরকি। সায়নদের বাড়ির মোড়টা পাড় হবার সময়ই মনে হলো কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। হ্যাঁ—, আবারও ডাকছে। পেছন ফিরে দেখি হাত-পা ছড়িয়ে ওই বটগাছতলায় মাটিতে বসে আছে একটি লোক। বেশ বড়সর চেহারা। এবার দেখি ভদ্রলোক আমার দিকেই তাকিয়ে হাতের ইশারায়—, হ্যাঁ—, পরিষ্কার আমাকেই তো ডাকছে। সাইকেল ঘুরিয়ে কাছে গিয়ে দেখে তো আমি একেবারে হতবাক। প্রায় বলা চলে বাকরুদ্ধ। এ যে সায়ন! কমপ্লিট সুটেড-বুটেড। মুখে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। চোখে দামি গোল্ডেন ফ্রেমের রিমলেস। একেবারে আপাদমস্তক টকটকে ফর্সা, যেন সাক্ষাৎ এক সাহেব। পাশে রাখা অল্প দু-একটি লাগেজ। মাটিতেই পড়ে আছে ইতস্তত। সায়ন আমারই সাথে পড়ত বলে দুজনেরই বয়েস একদমই এক। কিন্তু হলে কী হবে, সায়নকে দেখে চল্লিশ ছাড়িয়েছে কিনা তাও বোধহয় বলা যাবে না। বেশ কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও চিনতে মোটেই ভুল হলো না আমার। জিজ্ঞাসা করলাম, “তুই এখানে? এই সময়? তোর ছেলে, তোর মিসেস, ওরা কোথায়? ওরা কি অলরেডি বাড়ি চলে গেছে? ও-য় হো। সরি, সরি, সরি, তুই ছাড়া বাড়িতেই বা এখন যাবে কী করে! বাড়িটার যা অবস্থা! দুদিন তো লেগেই যাবে শুধু পরিষ্কার করতে!”
শান্ত সায়ন যেন নির্বিকার। আরও যেন বেশি শান্ত হয়ে গেছে বলেই মনে হলো। খুব নীচু স্বরে বলল, “আজ অফিস না গেলেই নয় তোর? চল্ না, এখানে একটু মাটিতে বসে মাটিকে স্পর্শ করে দুটো প্রাণের কথা বলি। পারবি না? কিরে, পারবি না?”
ছোটোবেলা থেকেই আমার না একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। অর্থে, বলে, সৌন্দর্যে দু-কদম এগিয়ে থাকা মানুষেরা অটোমেটিক আমার কাছ থেকে একটু বেশিই সমীহ আদায় করে নেয়। হতেই পারে ব্রিটিশ কলোনিয়ালিজমের দাসত্বের হাতকড়া থেকে হয়তো আমার এখনো মুক্তি ঘটেনি। তাই ফলস্বরূপ হয়তো পা-চাটা তাবেদারি প্রথাটা রক্তে গিয়ে মিশে। তাই—, না করতে পারলাম না। সাইকেল স্ট্যান্ড করে ওভাবে অফিস-প্যান্ট পরে মাটিতে বসতে কিন্চিৎ কিন্তু কিন্তু করায় সায়ন আমার হাত ধরে টেনে একপ্রকার জোর করেই মাটিতে বসিয়ে দিল। তারপর নিজে নিজেই বলতে আরম্ভ করল:—
অদিতি আর বাপ্পা আমার সাথে আসেনি রে। তারা আর কোনোদিন এখানে আসবেও না। তেমনি আমিও ওখানে আর কোনোদিনই ফিরে যাব না। এমনিতেই ওরা গ্রীন কার্ড হোল্ডার। এটা হতেই পারে যে ওদের এখনো ইচ্ছে পূরণ হয়নি। বাপ্পার জন্ম ওদেশে বলে আমি বাপ্পাকে কোনো দোষ দেব না। হতেই পারে শেকড়ের বা উৎসের টান এবং ভালোবাসা, যা মানুষের একান্তই অন্তরগত, তা আমি বাপ্পাকে বা অদিতিকে বোঝাতে অক্ষম হয়েছি। বাট্ সেক্ষেত্রে আমারও আর কিছু করার ছিল না। জানিস—! আমি জীবনের অনেক উচ্চতা দেখেছি। আমি বুর্জ-খলিফার টপ-মোস্ট ফ্লোরে রাত্রিবাস করেছি। আমি দেখেছি ওই ওপর থেকে, পৃথিবীর ওপর চড়ে বেড়ানো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অগণিত মানুষদের। আমি মাসাইমারার জঙ্গলে লায়ন-সাফারি করে সিংহ শিকার করেছি। আমি আটলান্টিকে কুড়িতলা ক্রুজে চড়েছি। তুই বল, কী করিনি আমি আমার এই এক জীবনে। যা আমি এতদিন চেয়েছি, তাই তো অনায়াসলব্ধ ছিল আমার। এখন এখানে এসেছি শুধু যা আমি জীবনে কোনোদিন পাইনি, যে স্বাদ আমি কখনোই চেখে দেখিনি—, তাই পেতে। মানুষের ভালোবাসা। মানুষের মন। মানুষের কথা। একেবারে আমার হৃদয়ের অন্তস্থ বাংলা-কথা। একেবারে বিশুদ্ধ ভেষজ। কতদিন আমি মাটির গন্ধ ভালো করে শুঁকিনি। সোঁদা মাটির গন্ধ। আমার নিজের দেশের মাটির গন্ধ। গরমকালে বাজারে পথচলতি আপামরের অথবা কৃষকের ঘামঝরা গন্ধ। আমের মুকুলের গন্ধ। ঝরা বকুলের গন্ধ। কতদিন আমি অনুভব করিনি আমার দেশের ভারী বাতাসটাকে। জানিস, কত বছর মশা, পিঁপড়ে, পোকামাকড় আমাকে যে কিছুই কামড়ায়নি। এগুলোই সব পেতে ইচ্ছে করে। ভীষণ পেতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে করে ছোটোবেলার সেই ১০ পয়সার লাল, নীল, সবুজ, হলুদ বরফের রঙিন আইসক্রিমগুলো চুষে চুষে খেতে আর সেরকম রঙিন দুটো ঠোঁট বানিয়ে ফেলতে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, সত্যি বলছি, এ’সব সব পেতে এখন আমার ভীষণ ইচ্ছে করে। জানিস! আমি কতদিন মানুষের প্রাণখোলা অট্টহাসি দেখিনি। তাহলে কী ওখানে এতদিন ধরে দেখেছি, তা না-হয় নাই বা বললাম। আমি জানি একলা থাকা হয়তো আমার পক্ষে একটু কষ্টকর। আমি এ’ও জানি, সবই যে অভ্যেস। আমি নিজের মতন করে আমার পৃথিবীকে, আমার জন্মভূমিকে করে নেব আপন। আমি থাকব একলা। আমি হব এই স্বাধীন দেশে, স্ব-অধীন এক নতুন মানুষ। পৈতৃক ভিটেটা মেরামত করব। তোরা সবাই— সবাই আসবি। গল্প করব। অনেক অনেক গল্প করব। জমে আছে অনেক না-বলা কথারা। মানুষের সাথে ‘মানুষের’ মতো মিশব। তারপর একদিন মিশে যাব এই মাটির সাথে একান্তে। সেই গানটা বুঝলি এখন খুব মনে পড়ছে, “মাটির ভেতর বন্দি যে জল লুকিয়ে থাকে— মাটি পায় না তাকে— মাটি পায় না তাকে—।”