"The whole mission of the project is to find holes in the language of emotion and try to fill them"
— John Koenig
মানুষের জীবনে কিছু এমন মুহূর্ত থাকে, যা সহজে অনুভব করা যায়, কিন্তু ব্যাখ্যা করা কঠিন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নিজের পুরনো বাড়ির দরজা খুলে সেখানে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় শৈশবটাকে কি কখনো নতুন করে আবিষ্কার করেছেন?
অথবা, বহু বছর পর পরিচিত কোন গানের সুর আপনার মনটাকে অকারনে কি ভারী করে তুলেছে?
নয়তো বা, কোন মানুষের চোখে নিজের কোন অজানা কষ্টের প্রতিচ্ছবি খুঁজতে চেয়েছেন কি?
এগুলি সবই এক ভাষায় প্রকাশহীন অনুভূতি, যেখানে শব্দের কোন অস্তিত্ব থাকে না।
কিন্তু শব্দ না থাকলে কি অনুভূতিগুলো মিথ্যে হয়ে যায়?
না।
মানুষের এমন গভীর কিছু সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতা সেই অনুভূতিগুলোকে জুড়ে থাকে, যেখানে প্রচলিত ভাষা কোন দখল নিতে পারেনি।
এই ভাষাগত শূন্যতাকে অনুভব করেছিলেন লেখক John Koenig।
তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, মানুষের আবেগের প্রচলিত অভিধানটি আশ্চর্যজনকভাবে সীমিত। আনন্দ, রাগ, দুঃখ, ভয়, ভালোবাসার মতো অনুভূতিগুলোর নির্দিষ্ট নামকরণ করা আছে, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে জন্ম নেওয়া অসংখ্য কিছু সূক্ষ্ম, জটিল অথচ ক্ষণস্থায়ী অনুভূতিগুলো থেকে যায় নামহীন।
এই শূন্যতাকে পূরণ করতেই তিনি শুরু করেন
"The Dictionary of obscure sorrows"।
নামহীন, অপপ্রকাশিত মানবিক অনুভূতিগুলো শব্দে তৈরি করার একটি সৃজনশীল প্রকল্প।
এই প্রকল্পেরই একটি শব্দ হলো - ক্রিসালিজম (Chrysalism)
এটি এমন একটি অনুভূতির শব্দ, যা হয়তো সাধারণ, কিন্তু এক মানবিক মুহূর্তে খুবই গভীর।
একটি অন্ধকার রাত। বাইরে প্রবল ঝড় বৃষ্টি। আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি। গাছগুলো ঝড়ের হাওয়ায় মাটির প্রায় কাছাকাছি। বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠছে চারপাশ।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আপনি ঘরের ভেতরে।
আপনার মাথার ওপরে একটি ছাদ।
চারপাশে পরিচিত শক্ত দেওয়াল, এক আবরণ। হাতে এক কাপ গরম চা।
জানালার ওপারে চলছে প্রকৃতির বিশাল তান্ডব।
আর এপাশে আপনি শান্ত, নীরব।
আপনি ঝড়ের অংশ নন,
ঝড়ের দর্শক।
আর আশ্চর্যের বিষয় হোলো -
এই দৃশ্য আপনার জন্য মনে কোন ভয় নয়। বরঞ্চ এক ধরনের গভীর প্রশান্তির অনুভূতি তৈরি করছে। এই অনুভূতিকেই John Koenig নাম দিয়েছেন ক্রিসালিজম (Chrysalism)।
তিনি লিখেছেন -
"The amniotic tranquillity of being indoors during a thunderstorm, listening to waves of rain pattering against the roof"
এখানে এই "amniotic tranquility" শব্দবন্ধটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মাতৃ গর্ভের ভেতর একটি শিশু বাইরের পৃথিবীর অজানা বিশৃঙ্খলা থেকে সকল সময়েই সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, নিরাপদ।
ঠিক তেমনিভাবেই ঝড়ের সময় ঘরের ভেতরে থাকা মানুষটিরও শান্ত থাকার কারণ এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ।
এটি কি কোন আরামের অনুভূতির জন্ম দেয়?
না।
সাময়িকভাবে পৃথিবীর বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করার একটি নিরাপদ মুহূর্ত।
এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসে ক্রিসালিজম (Chrysalism) কি নতুন কোন অনুভূতি?
না।
অনুভূতিটা নতুন নয়, নামটা নতুন।
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বর্ষা দেখেছে। ঝড় দেখেছে। ঝড়ের আওয়াজ শুনেছে। আগুনের পাশে বসেছে। গুহার ভেতর থেকে বাইরের পৃথিবীর পরিবর্তন দেখেছে। অর্থাৎ, নিরাপদ আশ্রয় থেকে প্রকৃতির শক্তিকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে রয়েছে। নতুন শব্দটি আমরা শুধুমাত্র সেই অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে নিয়েছি।
কোন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ যদি একটি বাতি জ্বালানো হয়, ঘরের জিনিসগুলো চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) হলো সেই আলো।
আবেগের দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মানুষ অনুভব করে না। অনুভূতিগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে। কোন অনুভূতিকে নাম দেওয়ার অর্থ তাকে নিয়ন্ত্রিত নয়, তাকে চিনতে সাহায্য করা। মনোবিজ্ঞানে আবেগ সনাক্ত করার ক্ষমতা ( Emotional Awarness) মানসিক সুস্থতার সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
যে মানুষ নিজের অনুভূতিগুলোকে চিনতে পারে, সে নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকেও আরোও সুসংগঠিত করে বোঝার ক্ষমতা রাখে।
বৃষ্টির দিনে কখনও কখনও অজানা কারণে মন খারাপ হয়।
আমরা বুঝিনা -
"কেন এমন অনুভব করছি?"
কিন্তু যদি জানতাম - "আমি হয়তো কিছু পুরনো স্মৃতি, নীরবতা এবং বর্তমান কিছু মুহূর্তকে সংমিশ্রণ করে এক মিশ্র অনুভূতির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি" - তাহলে সেই অনুভূতিটা হয়তো আর অচেনা থাকে না।
তখন আমাদের নিজের কাছেই ফিরে আসার রাস্তা তৈরি করে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) আক্ষরিকভাবে কোন বৈজ্ঞানিক শব্দ নয়।
এর পেছনের অভিজ্ঞতা মনোবিজ্ঞানের কয়েকটি ধারণার সাথে সম্পর্কযুক্ত।|সেটি কি রকম?
প্রথমতঃ, Safety বা নিরাপত্তাবোধ।
মানুষের মস্তিষ্ক বিপদ ও নিরাপত্তা - এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে বেশ সংবেদনশীল।
প্রকৃতির শক্তি, অনিশ্চয়তা, সম্ভাব্য বিপদ যেমন ঝড় কে প্রকাশ করে, ঠিক সেই সময়েই মস্তিষ্ক যদি বোঝে আমরা নিরাপদ, তখন একটা অদ্ভুত দ্বৈত অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
যেখানে ভয় আছে, কিন্তু বিপদ নেই।
শক্তি আছে, আঘাত নেই।
বিশৃঙ্খলা আছে, কিন্তু আশ্রয়ও আছে।
আর এখানেই ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর সৌন্দর্য্য।
"Look deep into nature, and then you will understand everything better"
— Albert Einstein
বহু যুগ ধরে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির একটি আবেগগত সম্পর্ক আছে।
পাহাড় আমাদের মুগ্ধ করে, নদী আমাদের মনকে শান্ত করে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা চিন্তায় হারিয়ে যাই।
এক্ষেত্রে, প্রকৃতির দৃশ্য আমাদের মনের ভেতরে যেভাবে প্রভাব ফেলে, কৃত্রিম পরিবেশ তা তৈরিতে ব্যর্থ।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) হল এমনই একটি অভিজ্ঞতা যা নির্দেশ করে বাইরে ঝড়, ভেতরে আমরা নিরাপদ। এই অবস্থায় মস্তিষ্ক দুই ধরনের সংকেত গ্রহণ করে - ১)প্রকৃতির শক্তি ও অনিশ্চয়তা
২)আমি নিরাপদ ।
এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার মিলন থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের গভীর মানসিক অভিজ্ঞতা।
বৃষ্টির শব্দের একটা ধারাবাহিকতা এবং ছন্দ আছে। সেখানে পুনরাবৃত্তিও থাকে।
হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ, চিৎকার বা শব্দের তীব্রতা আমাদের সতর্ক করে। আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে সম্ভাব্য বিপদের সংকেত দিয়ে সাবধান করে।
কিন্তু বৃষ্টির শব্দ?
এটি সংগীতের মতো। ধারাবাহিকতা আছে, ছন্দ আছে।
পূর্বানুমেয় পরিবেশের সংকেতের মাধ্যমে মনকে ধীরে ধীরে স্থির হতে সাহায্য করে। আধুনিক গবেষণায় হোয়াইট নয়েজ (White Noise) বা ধারাবাহিক পটভূমির শব্দ নিয়ে অনেক আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। এই হোয়াইট নয়েজ (White Noise) হলো এমন একটি শব্দ, যেখানে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ একসঙ্গে মিশে থাকে।
বৃষ্টি, বাতাস, সমুদ্রেব ঢেউ এই পর্যায়ভুক্ত। কিছু গবেষণা এবং তার ফল হিসেবে দেখা গেছে যে নির্দিষ্ট ধরনের কিছু ধারাবাহিক শব্দ মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে অথবা ঘুমের পরিবেশ উন্নত করতে বেশ সাহায্য করে।
তবে, কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বৃষ্টির শব্দ কারোর কাছে প্রশান্তিময় হলেও কারোর কাছে আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে অস্বস্তিকরও বটে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মন কাজ করে, তার পছন্দ-অপছন্দ জানিয়ে দেয়।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর মধ্যে যে গভীর বিষয়টি আছে তা হোলো নিরাপত্তাবোধ, নিরাপত্তার আশ্রয়।
এটি বার্তা দেয় -
"বাইরে শক্তিশালী কিছু ঘটছে, কিন্তু এই মুহূর্তে তুমি নিরাপদ।"
এই অনুভূতি মনকে যেমন শান্ত করে, শরীরকেও আমি নিরাপদ - এই অনুভূতিতে শিথিল করে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) স্নায়ুতন্ত্রের Parasympathetic Nervous System কে
সক্রিয় করে।
শ্বাস স্বাভাবিক হয়, হৃদস্পন্দন কমে, মন শান্ত হয়।
প্রকৃতি মানুষের মনের উপর এক অদ্ভুত প্রভাব ফেলে।
The Experience of Nature এ Rachel ও Stephen Kaplan দেখিয়েছেন যে প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের মনোযোগ পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।
Nature এর মধ্যে কিছুক্ষণ হাঁটার প্রস্তাব দেওয়া হয়
কাজের চাপ, নানা রকমের সমস্যা, মানসিক ও মনোযোগের ক্লান্তির থেরাপি হিসেবে। প্রাকৃতিক দৃশ্য মানুষকে অন্য ধরনের মনোযোগে নিয়ে যায়। একে বলা হয় Soft Fascination। অর্থাৎ যা মনকে ধরে রাখে, কিন্তু ক্লান্ত করে না।
বৃষ্টির দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি।
কিন্তু তা আমাদের মস্তিষ্কে কোনো চাপ সৃষ্টি করে না।
স্মৃতি পুনরুদ্ধার করে, আবেগকে ফিরিয়ে আনে।
তাইতো বৃষ্টির ফোঁটা আমাদের ইন্দ্রিয় কে জাগিয়ে তুলে ভেজা মাটির গন্ধ, টিনের চালের শব্দ, বর্ষার বিকেলের আলো, পুরনো বাড়ির বারান্দায় স্মৃতি হাতড়ায়।
তাই ক্রিসালিজম (Chrysalism) অতীত, বর্তমান এবং কল্পিত ভবিষ্যতের এক মিলনস্থল।
আমরা কেউই বিশৃঙ্খলাকে নিজেদের জীবনে দেখতে ভালোবাসি না।
কিন্তু, নিরাপদ দূরত্বে তাকে প্রত্যক্ষ করি। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, জানালা দিয়ে অঝোর বৃষ্টি দেখা, পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ঝড়ের মেঘ দেখা - প্রকৃতির এই রূপে আমরা বিস্মিত হই।
ধ্বংস অপেক্ষা এগুলো আমাদের অনেক বেশি বিস্মিত করে, যা অবশ্যই একটি মৌলিক অনুভূতি।
আমরা অনুভব করি -
পৃথিবীর এই বিশাল সৃষ্টির আমরা একটি ছোট অংশমাত্র। ক্রিসালিজম (Chrysalism) আমাদের মনে করায় -
জীবনের সব ঝড় থামানোর চেষ্টা করতে নেই। সেখান থেকে নিজের ভেতরে শান্তি ও একটি জায়গা, একটা আশ্রয় খুঁজে নিতে হয়।
"The Earth has music for those who listen"
— George Santyana
বৃষ্টি প্রকৃতির একটি অতি প্রাচীন রূপ।
এটি শুধুমাত্র জলের ধারাকে বোঝায় না, এটি একটি ঘটনা, সংকেত, একটি অনুভূতি।
আর আমাদের কাছে?
কৃষকের কাছে বৃষ্টি জীবন।
ভ্রমণকারীর কাছে বৃষ্টি বাধা।
প্রেমিকের কাছে সে অপেক্ষা।
কবির কাছে তার আত্মার আয়না, এক প্রতিফলন।
আর ক্রিসালিজম (Chrysalism) এখানেই বলে -
"প্রকৃতির একটি দৃশ্য মানুষের মনের ভেতরের একটি দরজা খুলে দিতে পারে।"
এই ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর অনুভূতি বাঙালি সংস্কৃতিতেও অতি সহজে ধরা পড়ে।
বর্ষা বাঙ্গালির একটি আবেগ। তা ধরা থাকে শৈশবের ছুটিতে, কাদায় পা ডোবানো একটি বিকেলে, দূরের মেঘলা আকাশে, জানালার পাশে বসে, পুরনো গানের সুরে, অথবা, অপেক্ষার অনুভূতিতে।
বর্ষা প্রকৃতি এবং মানুষের অন্তর জগতের সাথে একাকী হয়ে ওঠা একটি ঋতু।
সেই কারণেই ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর অনুভূতি বাঙালি সংস্কৃতিতেও দেখা মেলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণিত বর্ষা প্রকৃতি শুধুমাত্র প্রকৃতির বর্ণনায় নয়, ধরা দিয়েছে মানবিক জগতেও - তাই তো বৃষ্টি যদি বিষন্নতা হয়, কখনও তা আবার হয়ে ওঠে আনন্দ।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর ভাষায় বলা যায় -
বৃষ্টি জানালার বাইরে পড়ে। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি তৈরি হয় মানুষের ভেতরে, তার অন্তর জগতে।
এ প্রসঙ্গে কবি জীবনানন্দ দাশের কথাও উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি এক গভীর নিঃসঙ্গতার সাথে যুক্ত।
ধানক্ষেত,নদী, পাখি, অন্ধকার, বৃষ্টি নিয়ে প্রকৃতি চমকপ্রদ নয়, নীরব প্রকৃতি তাঁর বর্ণনায়।
জীবনানন্দের প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বকে নির্দেশ করে।
মানুষের স্মৃতি, ক্লান্তি এবং একাকীত্ব জুড়ে আছে সেই প্রকৃতিতে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) এ কখনও এই অনুভূতি একই সুরে কথা বলে -
নীরবতা মানেই শূন্যতা নয়। এর মধ্যেই কখনও কখনও সবচেয়ে গভীর কথোপকথন ঘটে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীতে প্রকৃতি এসেছে নিজে একটি চরিত্র হিসেবে। শুধুমাত্র পটভূমি থাকেনি।
গ্রাম বাংলার মাঠ, বন নদী, ঋতু পরিবর্তন - সবকিছুকে মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তিনি জুড়ে দিয়েছেন।
আজ বিজ্ঞানীরা যখন প্রকৃতির মধ্যে মানুষের একাত্ম হওয়াকে মানসিক সুস্থতার অন্যতম পথ হিসেবে নির্দেশ করেন,
তখন দেখা যায় যে, সাহিত্যের বহু শ্রদ্ধেয় লেখকেরাই এই সত্যকে অনেক আগেই অনুভব করেছিলেন।
বৃষ্টি কখনো ধ্বংসের পরে শুরুর প্রতীক। স্মৃতির দরজা। একাকিত্বের সঙ্গী।
আত্মশুদ্ধির রূপক। প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে মানুষের মনের ভেতরের পরিবর্তন আজও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত আছে।
অনেক কবি বা লেখকের লেখনীতে যা অনেকবার ধরা পড়েছে।
এই ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর কেন্দ্রে একটি বিষয় দেখা যায়, যা হলো - জানালা।
একটি সীমারেখা, দুটো জগতের মধ্যে একটি সেতু।
যেখানে একদিকে বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে নিরাপত্তা।
একদিকে ঝড়, বৃষ্টি। অন্যদিকে নীরবতা, শান্তি।
মানুষের সম্পর্কটাও এমনি।
আমরা সম্পর্কও চাই, একাকীত্বও চাই।
পরিবর্তন চাই, স্থিরতাও চাই।
এই দ্বৈততার মধ্যেই আমাদের অস্তিত্ব, যা ক্রিসালিজম (Chrysalism ) এর মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) শুধু বৃষ্টি, ঝড় কে দেখায় না। সে এমন একটি সংস্করণ কে তুলে ধরে যেখানে মৃদু বিষন্নতা থাকে। যা শান্তির, যা স্মৃতির। মানুষ তার শিল্পে, তার সৃষ্টিতে সবসময় উপমা ব্যবহার করে।
শিল্প, সৃষ্টির কাজ থাকে সেই নামহীন অনুভূতিকে ভাষার প্রয়োগে প্রকাশ করা। আর ক্রিসালিজম (Chrysalism ) এই কাজটাই করে।
সে বলে -
"তোমার এই অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি অকারণ নয়। এর একটি নামও আছে।" মানুষ প্রকৃতির মাধ্যমে কি অনুভব করে? আসলে আমরা নিজেদের মনের অন্তর জগতেই ঘোরাফেরা করি।
আমরা প্রকৃতিতে শুধু ঝড় দেখি না। সেখানে থাকে মনের ভয়, উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা, স্মৃতি, আমাদের বেঁচে থাকার মতো মানবিক অনুভূতি।
তাই ক্রিসালিজমও মনে করায় বৃষ্টির অনুভূতিতে থাকে মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসার একটি মুহূর্ত -
"ঝড়ের মধ্যেও আশ্রয় খোঁজা।"
জীবনের একটা অদ্ভুত সত্য হলো -
মানুষ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। বাইরের আবহাওয়ার পরিস্থিতি সে পরিবর্তন করতে না পারলেও, সেই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে বা নিজেদের জীবনযাত্রাকে পরিবর্তন করে খাপ খাওয়াতে পারে।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর গভীর শিক্ষা জুড়ে থাকে এখানেও।
জীবনের সমস্যার বিরুদ্ধে, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শিক্ষা আমরা সকল সময় পেয়ে থাকি।
কিন্তু প্রকৃতি আমাদের অন্য গল্প বলে।
ঝড় হলে সব গাছ শক্তভাবে, মাথা উঁচু করে থাকে না। কিছু গাছ নুইয়ে পড়ে বাতাসের সঙ্গে।
কারণ কি জানেন? নমনীয়তা অনেক সময় শক্তির চেয়ে বেশি কার্য্যকর।
মানুষের ক্ষেত্রেও তাই।
নিজের দুর্বলতাকে কোন কোন সময় স্বীকার করে, নিজের ক্লান্তিকে গ্রহণ করে, কিছু সময় থেমে দাঁড়িয়েও মানসিক শক্তির পরিচয় দেওয়া যায়।
অনেক সময় থামতে হয়।
ক্রিসালিজম (Chrysalism ) সেই থেমে যাওয়ার একটি মানসিক শক্তির প্রতীক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া মনোরোগ বিশেষজ্ঞ Victor FrankI দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের জীবনের অর্থ কি?
তাকে সঠিকভাবে খোঁজার ক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Man's Search For Meaning এ তিনি লিখেছেন -
"When we are no longer able to change a situation we are challenged to change ourselves."
এই ভাবনার সাথে ক্রিসালিজম (Chrysalism) এর বেশ মিল পাওয়া যায়।
বাইরে যে ঝড় ওঠে, তা কি আমরা বন্ধ করতে পারি?
কিন্তু আমাদের হাতে থাকে ঝড়ের প্রতিক্রিয়া কিভাবে জানাব।
আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কিভাবে দেখছি বা তার কি অর্থ খুঁজছি - সেটা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে আমারই নিয়ন্ত্রণে।
পরিস্থিতি আমাদের আয়ত্তে না থাকলেও অবস্থান বেছে নেওয়ার ক্ষমতা আমাদের অনেক সময়ই থাকে।
এ প্রসঙ্গে Victor FrankI এর কথাগুলো উল্লেখ্য -
"Between stimulus and response there is a space"
এই "space" বা অন্তরালটিই হয়তো প্রতীকী অর্থে ক্রিসালিজম (Chrysalism)।
আজকের আধুনিক জীবনে ক্রিসালিজম (Chrysalism) বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের সময়ে আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীর যে জায়গায়, তো মনের হদিশ সেখানে থাকে না।
খাওয়ার সময় ফোন ঘাঁটা,
হাঁটার সময় খবরে মনোযোগ,
বিশ্রামের সময় কাজের কথা ভাবা - এসবের ফলে নীরবতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বেশ দুর্বল। কিন্তু ঠিক করে বলুন তো, আমাদের মন কি সকল সময় শব্দ
চায়?
না।
কখনো কখনো সেই মন চায় একটি থেমে থাকা বিকেলে জানালার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টির সাক্ষী হতে।
একটা মুহূর্ত, যেখানে কোন কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজেকে দৌড়তে হবে না।
শুধু থাকতে হবে,
থামতে হবে।
দার্শনিক Carl Gustav Jung লিখেছিলেন -
"Who looks outside, dreams; who looks inside, awakes."
মানুষ যখন প্রকৃতিকে উপলব্ধি করে, তখন অনেক সময় সে নিজেকেও অনুভব করে, চিনতে শেখে। বৃষ্টির দিকে যার মুগ্ধভাবে চাওয়া আসলে সে তার জীবনকেই নতুন ভাবে দেখছে।
তার ভাবনায় সেই সময় থাকছে -
"আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
কি হারিয়েছি?
কি পেয়েছি?
কি পরিবর্তন দরকার? কেন দরকার?
হাজার প্রশ্ন - এক আত্ম-পর্যবেক্ষণ।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) হলো এমন একটি আত্মমগ্নতা, যা বৃষ্টিকে সাক্ষী করে অতীতের অনুশোচনা বা ভবিষ্যতের ভয় থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত হয়।
সে বর্তমান অবস্থানে উপলব্ধি করে -
বৃষ্টি পড়ছে।
তার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
আর আমি তা উপভোগ করছি।
এই সকল উপস্থিতিই তার শান্তি, এক আশ্রয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, আমরা অবস্থার জন্য আশ্রয় নিতে শিখি, তবে অবস্থা থেকে পালাতে নয়।
বাস্তবতা থেকে দূরে যাই না আমরা।
একটি ঝড়ের সন্ধ্যায় বৃষ্টি দেখা সুন্দর। কিন্তু জীবনের প্রতিটি সমস্যার সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়াটা কিন্তু সমাধান নয়।
এখানেই ক্রিসালিজম (Chrysalism) আমাদের শেখায় প্রথমে আশ্রয় নাও।
তারপর সেই আশ্রয়ে শক্তি সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বাইরে এসো।
ক্রিসালিজম (Chrysalism) এখানে একটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
"Chrysalis" এর অর্থ হল প্রজাপতির রূপান্তরের আগের অবস্থা-- একটি আবরণ, যার ভেতরে পরিবর্তন ঘটে।
ঠিক এই অর্থে "chrysalis" তাৎপর্যপূর্ণ।
যেখানে মানুষের জীবন ও কিন্তু বিভিন্ন সময়ে একেকটি রূপান্তরের পর্যায় অর্থাৎ chrysalis এর মধ্যে দিয়ে যায়।
বাইরে থেকে স্থির দেখালেও ভেতর পরিবর্তনশীল।
কোনো কোনো সময় নিঃসঙ্গতা জীবনের আসল প্রস্তুতির সময় নেয়।
নীরবতা থাকে সেখানে নতুন শুরুর একটি বিরতি হয়ে।
ঝড়ের রাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোলসের ভেতরে থাকা লোকটির নিজের ভেতরেও কিছু রূপান্তর ঘটে চলেছে। শেষ পর্যন্ত ক্রিসালিজমChrysalism )আমাদের শেখায়, জীবনে ঝড় থাকবেই। কখনো বাইরে, কখনো ভেতরে।
কিন্তু তাকে খুঁজে নিতে হবে, আবিষ্কার করে চিনে নিতে হবে নিজের ভেতরে থাকা সবচেয়ে বড় আশ্রয়টি কে।
এই আশ্রয়ে সে ফিরতে পারবে, নিজেকে ফিরে ফিরে দেখতে পাবে। যেখানে পৃথিবীর মধ্যে, শত শব্দের মাঝে তার নিজের খোলস, একটি শক্ত আবরণ। যেখানে থাকে শুধুই নীরবতা।
জানালার ওপারে ঝড় একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অবস্থা। সে থাকবেই।
কিন্তু জানালার এইপাশে যদি একটি শান্ত মন থাকে, নীরব ব্যবহার থাকে, তবে সেই ঝড় ভয়ের কারণ নয় - উপলব্ধির মুহূর্ত হয়ে থাকে যেখানে অনুভূতিরা থেকে যায় নামহীন।
আর সেই নীরব মুহূর্তের নামই - ক্রিসালিজম (Chrysalism)।
References (নির্বাচিত):