"উড়ি চেলে গুঁড়ি কুটি সাজাইলো পিঠা,
ক্ষীর খণ্ড ছানা ননী পুর দিয়ে মিঠা।"
(বারবনিতাদের রন্ধন-পারদর্শিতা সম্পর্কে লেখক ঘনরাম তাঁর 'ধর্মমঙ্গল' কাব্যে)
"চালের গুঁড়ো, আটা, নুন,নারকেল কোরা,এক চামচ তেল ও সামান্য জল দিয়ে সব উপকরণ ভালো করে মেখে রাখতে হবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট.."
"এই পিঠের নাম কি মা?"
"হৃদয়হরণ পিঠে সোনা..."।
"এরম কেনো?" প্রশ্ন করেই গোপাল মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে মা কি নিপুণ ভাবে রুটি গুলি কে ভাঁজ করে হৃদয় আকার দিয়ে সাজাচ্ছে....।
"আচ্ছা মা আর কি কি পিঠে হয়?"
"পাটিসাপটা,গোকুল পিঠে,আঁদোশা,মুগসামলি, মুগতক্তি,রসবড়া,ভাজা পুলি,ক্ষীরপুলি,দুধপুলি, তবে পাব্বনের প্রধান হলো গিয়ে সরা পিঠে."।
গোপাল মোহনপুর গ্রামের রমেন মিত্রের ছেলে,, পেশায় রমেনবাবু মন্দির এর পূজারী হলেও তার ইচ্ছা ছেলে উচ্চমানের শিক্ষা নিয়ে সমাজে বড় কিছু করুক। গোপাল বাবার কাছে ইতিহাস শোনে,ভূগোল জানে,শেখে অঙ্ক কষা।
আজ পৌষ সংক্রান্তি, গাঁয়ের জমিদার বাড়ি থেকে হরি চাষী, সবার বাড়ি তেই আনন্দের আমেজ,, বছরের এই বিশেষ কিছু দিন গুলিতে (যেমন পৌষ সংক্রান্তি, বৈশাখী, ভূত চতুর্দশী, চড়ক,ধানলক্ষী ইত্যাদি) পাড়ার যদু পণ্ডিত এর বাড়িতে চলতো দেদার চর্চা।
চর্চার বিষয় বস্তু ইতিহাস,সাহিত্য,ভূগোল আরও অনেক কিছু।
গোপাল সেদিন বাবার হাত ধরে যায় আড্ডার আসরে,, বিষয়বস্তু -- "পিঠা ও পার্বণ"।
যদু পণ্ডিত বলতে থাকেন,চৈত্যন্যমঙ্গল অনুযায়ী নিমাই এর সাথে লক্ষীদেবীর বিবাহের পর নববধূ প্রথমদিন কি রাঁধেন জানো?
"পঞ্চাশ ব্যঞ্জন অন্ন রাঁধিল কৌতুকে/পিষ্টক পায়েস অন্ন রান্ধিল একে একে"
চৈতন্যদেব এর জন্যে ভক্তবৃন্দরা যাই রান্না করুন না কেন, তার মধ্যে পিঠেপুলি থাকবেই - মুদগ বড়া, কলা বড়া,মাস বড়া,ক্ষীর পুলি নারকেল পুলি পিঠা ইত্যাদি ইত্যাদি।
কৃত্তিবাস এর 'রামায়ণ' এ জনক ভূপতি তার কন্যার বিবাহে অতিথি আহার্যে 'পরমান্ন পিষ্টক' রাখতে ভোলেননি। যদি আরো পিছনে যাওয়া যায়,মনসামঙ্গল কাব্যে দ্বিজ বংশীদাস লিখছেন "কত যত ব্যঞ্জন যে নাহি লেখা জোখা / পরমান্ন পিষ্টক যে রান্ধিছে সনকা ......"
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ে দেখা যায়, বছরের প্রথম দিনে বানানো প্রথম পিঠা ঘরের চালের উপর দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয় যাতে ‘শেয়াল-কুকুরে' তা খেতে পারে৷ এটুকু বলে থামলেন যদু পণ্ডিত।
সত্যিই এই দিনগুলোতে মেয়েদের চুল পর্যন্ত বাঁধার সময় থাকেনা, চলে পুঁজি অনুযায়ী আচার অনুষ্ঠান বজায় রাখার এক অনন্য লড়াই। অঘ্রাণ মাসের প্রথম ধান উঠলে মা ঠাকুমা রা ঢেঁকিবৌদের সাথে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভেনে চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা করেন। নিয়মানুযায়ী, বাউনি বাঁধার আগে মাটির সরায় পিঠে ভাজতে হয়। বাউনি অর্থ লক্ষ্মীর বন্ধন। পাকা ধান গোলায় তোলার প্রতীক হিসেবে, কয়েকটি পাকা ধানের শিষ দিয়ে বিনুনি করে, বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে সেগুলি বেঁধে দেওয়া হয়। ভাবা হয় এইভাবেই চিরতরে বাঁধা পড়ে থাকবে সৌভাগ্য। পিঠে ভাজা শেষ হলে তা সেই সরার ওপর রেখে, তার ওপর মাটির তৈরি ঢাকনা চাপা দিয়ে, সেই ঢাকনার ছোট্ট-গোল মাটির হাতলকে বেড় দিয়ে প্রথম বাউনিটি বেঁধে দিতে হয়।
জমিদার বাড়িতে আবার ঢেঁকিশাল থেকে আনা হতো একমণ চাল,তারপর তা ভেজানো,কোটা,হামানদিস্তা তে গুঁড়ো করা সে যদিও বা কম মনে হয় পাঠকের,নারকেল কোরা, শাঁস কেটে কেটে দেওয়া, আমআদার আভাস মেশানো বাপু চার কেনো, আটটি খানিও কথা না। মন লাগাতে হতো ষোলো আনা।
গপ্পের আসর থেকে ফিরে গোপাল দেখে মা উনুনে আঁচ দিচ্ছেন,ওবেলা বাবা রবিন গয়লার বাড়ি থেকে পূজা সেরে ক্ষীর এনেছিলেন,তাই জ্বাল দেওয়া হবে,এক কোণে বসে পাশের বাড়ির মালতী কাকিমা নারকেল কুড়ছেন। বাঁশের খুঁটি আর মাটির লেপ দেওয়া রান্নাঘরের প্রায় প্রতিটা কোন আর ওপর চাল কালিঝুলির শিকার,আলো বলতে একটা হ্যারিকেন ভরসা। তবু যেন আসন্ন পিঠে রান্নার আমেজ আর খুশিতে পরিপূর্ণ।
পিঠে পরিবারের মান্যগণ্য সদস্য হলো পুলিপিঠে।
খুব সাবধানে তৈরি করা হয় পুলিপিঠে। সেগুলো দুধে দিয়ে ফোটানোর সময় খুলে বা ফেটে গেলেই বিপদ! সব পরিশ্রম তাহলে মাঠে মারা যাবে! হয়তো অজানা কোনও দেবতাকে বলছেন— মুখরক্ষা যেন হয়! তুমি দেখো, ঠাকুর!
"লৌহ কঠিন,পাথর কঠিন,আর কঠিন ইস্টক
তার চেয়েও কঠিন কন্যা তোমার হাতের পিষ্টক।"
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(শান্তিনিকেতনের এক মেয়ের হাতের পিঠে খেয়ে)।
"তাহলে কাল তো পৌষ পার্বণ,কার কার বাড়িতে কি কি পিঠা হচ্ছে তাহলে?"
প্রশ্নটা করেই ইতিহাসের শিক্ষক শ্রীমান গোপালচন্দ্র মহাশয়ের মনে পড়ে গেলো তিনি তো আর তার ভালবাসার পুরানো মোহনপুরে নেই। প্রশ্নের উত্তরে সুমন নামের ছাত্রটি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে জানালো "দেশের বাড়িতে দিদিমা থাকতে পাটিসাপটা খেয়েছিলাম, আর হয়েছিল মাটির গোল গোল করে কাটা সরায় তৈরি ছাঁচ এর পিঠা"। আর্য বলে ওঠে, "ভাপা পিঠা?" সে নাকি গতকাল রাতে পাশের পার্কে সংস্কৃতি মেলায় বাবার সাথে গিয়ে খেয়ে এসেছে। রাস্তার খোলা পিঠে খাবার দরুণ পিঠেও দু ঘা পড়েছে যদিও।
রক্তিম প্রশ্ন করে বসে, "স্যার পৌষমাসেই কেনো পিঠে হয়?''
গোপালচন্দ্র মৃদু হেসে জবাব দেন, ''বৈশাখী এবং শারদীয়া তেও পিঠে বানানো হয় অনেক জায়গায়। তবে কিনা পৌষমাস হলো লক্ষ্মীমাস। কৃষিজীবী বাংলায় এই সময়েই ধান উঠত চাষির গোলায়। ধান মানেই তো ধন। সম্পদ। তাই এই সৌভাগ্যকে উদযাপন করার জন্য পৌষের শেষ দিনে পার্বণের আয়োজন। সঙ্গে কামনা,বারোমাসই যেন পরিবারে পৌষের সমৃদ্ধি বজায় থাকে।''
ছুটি দিয়ে উঠে ১৭/৫ হরিতকি লেন ধরে বাড়ির পথ ধরলেন গোপালচন্দ্র। শহরে এসে তিনি উপলব্ধি করেছেন, যৌথ পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার সাথে সাথে ভাঙন ঘটেছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের। মাইক্রোভেন,চিমনি, ফ্রাইং প্যান এর দুনিয়ায় 'আসকে' পিঠে কিংবা বাঙাল-প্রচলিত 'চিতই' পিঠে চেনা বা খাওয়ার উপায় বলতে এই শীতের মেলা তে বসা কিছু বয়স্ক কিংবা আদি মানুষের ঠেলাগাড়ি কাম স্টল।
আবার হয়তো দেখা গেলো মেলায় খাবারের স্টলে ঝাঁ-চকচকে Espresso মেশিনের পাশে ট্রে তে রাখা পাটিসাপ্টা। তারপাশে হয়তো ভাপা পিঠে। চাকরিজীবী মহিলাদের পৌষসংক্রান্তির দিনও প্রতিদিনের মতো আপিস যেতে হয়। এটাই একালের দুনিয়া। মেট্রোসিটির ঝাঁ চকচকে জীবনযাপনের প্রভাব ইদানিং তার মোহনপুর গ্রামেও বেশ টের পেয়েছে গোপালচন্দ্র। উপরি পাওনা মধুমেহ রোগ বা ‘সুগার’ এবং ‘ডায়েট কন্ট্রোল’ করে দেহ সুঠাম রাখার জন্যে মিষ্টির প্রতি অনীহা।
সংক্রান্তির দিন, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া গোপালচন্দ্র খুঁজে বেড়ায় বাঙালির সেই আদিম সুস্বাদ,নতুন ঝোলা গুড়,সাথে মায়ের বানানো গোবিন্দভোগের পায়েস।
পাশের ফাস্ট ফুড সেন্টারে ঢুকে বাবান আর স্ত্রী সুমিত্রার জন্যে কাটলেট আর স্বর্মা রোল নিতে নিতে নিজের মনে মনে গোপালচন্দ্র বললেন
"পিঠে বড্ড মিষ্টি"।