সৌন্দর্যের কত রূপ আর ব্যাখ্যা। আর সেগুলো প্রয়োগ করার গিনিপিগ হল নারী। সারাবিশ্বে সৌন্দর্যের নামে চলা অজস্র ঐতিহ্যবাহিত প্রথাসিদ্ধ নারী-নির্যাতনগুলির মধ্যে বিশিষ্ট স্থানাধিকারী স্ত্রী-জননাঙ্গ বিকৃতি (FGM), চিনের পা-বাঁধাই (Foot Binding) ও স্তন ইস্ত্রী (Breast Ironing) নিয়ে ইতিপূর্বে বিস্তর লিখেছি। এখানে আরও তিনটি উদ্ভট সৌন্দর্যায়নের পরিচয় দিলাম।
একদা ব্রহ্মদেশ বা এখনকার মায়ানমারের এই লম্বা গলার সুন্দরীরা সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে একটা দর্শনীয় ব্যাপার। চিন দেশে পা দুমড়ে মুচড়ে সুন্দর করা এখন বেআইনি ও অপ্রচলিত। কিন্তু মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের মায়ানমার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামে মরালগ্রীবার ‘সুন্দরী’রা পর্যটন শিল্পে রীতিমতো বিজ্ঞাপিত।
মায়ানমার বা পূর্ববর্তী ব্রহ্মদেশে (Burma) রেড কারেন বা কারেন্নি জাতিগোষ্ঠীর (Red Karen or Karenni people) একটি উপজাতি হল কায়ান (Kayan)। টিবেটো-বর্মন শ্রেণীর এই উপজাতি মায়ানমারে সংখ্যালঘুই বলা চলে। তবে তাদের একটি প্রথার নৃতাত্ত্বিক তথা পর্যটন শিল্পে গুরুত্ব যথেষ্ট। এদের আবার ৬-৭টি শাখা আছে – কায়ান লাহই (Kayan Lahwi) বা পাডং (Padaung), কায়ান কা খউং (Kayan Ka Khaung) বা গেখো (Gekho), কায়ান লাঠা (Kayan Lahta), কায়ান কা গান (Kayan Ka Ngan), কায়ান গেবার (Kayan Gebar), কায়ান কাখি (Kayan Kakhi) এবং বিউ বা কায়াও (Bwe people or Kayaw)। এর মধ্যে ‘কায়ান লাহই’, যারা শান ভাষায় ‘পাডং’ বলে উল্লিখিত, তাদের মেয়েদের মধ্যে গলায় পেতলের আংটা পরার রেওয়াজ আছে। এরাই হল পর্যটন জগতের বিস্ময় “লম্বকণ্ঠী ললনা”।
থাইল্যান্ডের উত্তর দিকে মাই হং সন (Mae Hong Son Province) প্রদেশেও কায়ান জাতি আছে, যাদের পাডং পরিচয়ে আপত্তি আছে। খিন মউং নিয়ান্ত (Khin Maung Nyunt) নামে জনৈক লেখক তাঁর ‘The Hardy Padaungs’ (1967) বইতে লিখেছেন কায়ানরা পাডং নামটা অপছন্দ করে। অন্যদিকে কায়ান লেখক পাস্কাল খু থিউই (Pascal Khoo Thwe) ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা ‘From the Land of Green Ghosts: A Burmese Odyssey’ গ্রন্থে আবার নিজের সম্প্রদায়কে পাডং বলেই উল্লেখ করেছেন। যাই হোক, ১৯৮০-৯০ দশকে মায়ানমারে সামরিক শাসনের সময় বেশ কিছু পাডং বা কায়ান মানুষ থাইল্যান্ডের সীমা অতিক্রম করে আশ্রয় নেয়।
এদের মধ্যে সেই মরাল গ্রীবার মহিলারা বিশেষ পর্যটক আকর্ষণ হিসাবে কায়ান সমাজে যে আর্থিক আমদানি প্রবাহিত রেখেছে, তাতে কায়ানরা শরণার্থী হলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মোটামুটি স্বনির্ভর হওয়ায় বিশেষ সাহায্যপ্রার্থী নয়।
২০০৪-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী কায়ানদের জনসংখ্যা ১,৩০,০০০। তার মধ্যে ৬০০ কায়ান মায়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকার তিনটি পর্যটনমূলক গ্রাম জুড়ে বসবাস করে। এই গ্রামগুলির মধ্যে হুয়াই সেউ টাও (Huai Seau Tao) আবার লম্বা গলার মেয়েদের প্রতি কৌতূহলের জেরে একটি বাণিজ্যিক গ্রাম। আর পাঁচটা সমাজের মতো কায়ান তথা পেডংদেরও জাতিগত বৈশিষ্ট্য বহন করার দায়িত্ব বর্তায় মেয়েদের ওপরেই, যারা ছোট থেকেই কৃত্রিম উপায়ে গলা প্রলম্বিত করতে থাকে।
গলা লম্বা করার পদ্ধতিটা হল একটার পর একটা ধাতব, সাধারণত পেতলের, আংটা (coils) গলার চারপাশে বেড় দিয়ে লাগিয়ে দেওয়া। বছর পাঁচেক বয়স হলেই কণ্ঠ-বেড়ি পরানো শুরু হয়। যত দিন যায়, তত গয়নার প্যাঁচ ও দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়। গয়নার মতো ব্যাপার, তবে এই গয়না নিজে নিজে খুলে ফেলা যায় না। যার গলা যত লম্বা, সে তত রূপসী। প্যাচপ্যাচে গরমে ঘেমে ধাতুর ক্রমাগত ঘষায় অ্যালার্জি বা ঘা হলেও সুন্দরী হতেই হবে।
পেতলের আংটার ওজনে কণ্ঠার হাড় বা অক্ষকাস্থি (collar bone) নীচের দিকে নেমে যায়, শিরদাঁড়া ও ফলত বুকের পাঁজর (rib cage) চাপে সংকুচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রীবাটি লম্বা হয় না, সেটি প্রলম্বিত লাগে, যেহেতু নীচের সামনের স্কন্ধাস্থি (clavicle) চাপে বিকৃত হয়ে যায়।
কেন যে এই বিচিত্র গহনা পরিধান, তা নিয়ে ভ্রাম্যমান নৃতাত্ত্বিকরা একেকজন একেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, গলায় ভারী আংটা পরিয়ে ঘাড় লম্বা করে দিলে তাদের শারীরিক আকর্ষণ কমে যায় এবং অন্যান্য উপজাতি দ্বারা যৌনদাসত্বের জন্য বন্দী হওয়ার আশঙ্কা এড়ানো যায়। এরকম যাঁরা বলেছেন, বলা বাহুল্য, তাঁদের চোখে মরাল-গ্রীবার অধিকারিণীরা আর যাই হোক সুন্দরী তো নয়ই।
নৃতাত্ত্বিকরা অনেকে অবশ্য স্ত্রী জননাঙ্গ ছিন্নভিন্ন করার মধ্যে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা বজায় রাখতে তাতে অন্য জাতির হস্তক্ষেপ করার বিপক্ষে। তবে বিপরীত মেরুতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির ধারণাটাই বহুল প্রচলিত। যৌন আবেদন বাড়াতেই এই বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি, যে যৌন দ্বিরূপতা (sexual dimorphism), তা কিছু কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীতে সহজাত হয়ে থাকে। আবার লম্বা গলা বা ঘাড় মেয়েদের সঙ্গে ড্রাগনের সাদৃশ্য রচনা করে, লোকগাথায় যে ড্রাগন প্রবলভাবে বিরাজমান।
প্রসঙ্গত, চিরাচরিত কায়ান ধর্ম নাম ‘কান খোয়ান’ (Kan Khwan) মনে করা হয়, ব্রোঞ্জ যুগে (Bronze Age) কায়ান বা পাডংরা মোঙ্গলিয়া থেকে আসার সময় থেকেই বাহিত। সেই ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী কায়ানদের উৎপত্তি হয়েছিল স্ত্রী ড্রাগনের সঙ্গে পুরুষ মানুষের মিলনে, যার আর এক নাম “দেবদূত সংকর” (angel hybrid)।
এই অস্বস্তিকর অলঙ্কারের কারণ খুঁজতে গিয়ে আংটার স্তর আক্ষরিক অর্থে, রূপকার্থে, মেয়েদের বাঘের (পুরুষের?) কামড় থেকে রক্ষা করবে—এমন তত্ত্বও উঠে এসেছে। মেয়েদের প্রশ্ন করলে ঐতিহ্যরক্ষা বা সৌন্দর্যবৃদ্ধির অতি পরিচিত তোতা বুলিই শোনা যায়।
গলায় একবার ধাতব বকলস চাপলে তা আর সরানো হয় না, যদি না নতুন বৃহত্তর গুরুতর আংটা বা বেড় পরানোর আয়োজন হয়। তাছাড়া খোলা হতে পারে নিতান্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে। এগুলো খোলা-পরা রীতিমতো ঝকমারি ও সময়সাপেক্ষ। বেড়িতে চাপা পড়া গলার পেশি দুর্বল হয়ে যায়, গ্রীবা ও কণ্ঠাস্থির প্রভূত ক্ষতি হয়, রং ফ্যাকাসে হয়ে যায়, ধাতুজনিত অ্যালার্জি হতে পারে।
মোটা ধাতব রিং-এর চাপে গলা ও কলার বোনের যা বর্ণহীন ও হতশ্রী দশা হয়, যে অধিকাংশ মহিলা সেগুলো ঢেকে রাখার জন্যই আংটাগুলো খুলতে চায় না। তাছাড়া দীর্ঘ পরিধানের অভ্যাসে বোঝাগুলোই শরীরের অঙ্গ হয়ে যায়, ভারমুক্তিতেই অস্বস্তি লাগে তখন।
২০০৬ সালে মায় হং সন (Mae Hong Son) অঞ্চলে কিছু তরুণী প্রথম গলার আংটা খুলে ফেলে প্রথাগত অবদমনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। পরে ২০০৮ সালে যেসব মহিলারা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়, তারাও গলার আংটা খুলতে শুরু করে। কারও গলায় ৪০ বছর ধরে পরে থাকা বেড়ি হঠাৎ খুলে ফেলায় স্বভাবতই প্রথমে অস্বস্তি তো হবেই, কিন্তু সেটা কেটে যেতেও তিন দিনের বেশি লাগেনি।
বহির্বিশ্বে আধুনিক সাব্যস্ত হতে মায়ানমার সরকারও ইদানীং মেয়েদের আংটা পরিধানে নিরুৎসাহিত করছে।
এদিকে বিচিত্র ঐতিহ্যের সংগ্রহশালা দেখতে পর্যটকদের আকর্ষণ কম নয় বলে থাইল্যান্ডে এই প্রথা জনপ্রিয়তা ও পৃষ্ঠপোষকতাও পাচ্ছে। দীর্ঘকণ্ঠীদের দেখার জন্য গ্রামে ঢোকার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৬০০ বাহ্ট (Baht)। তাই বাইরের দেশে পুনর্বাসনের আহ্বান থাকলেও কায়ানদের যেতে সহযোগিতা করা হচ্ছে না। তারাও উপার্জনের টানে আটকে আছে। শুরু হয়ে গেছে বাজার ধরার প্রতিযোগিতা।
Karenni National People's Liberation Front (KNPLF) নামে একটি সশস্ত্র সংঘর্ষবিরতি বাহিনী (armed cease-fire group) আবার কায়ানদের নিজস্ব কায়ান রাজ্যে নিজেদের পর্যটন পল্লী নির্মাণেও আহ্বান করেছে। উচ্চবিত্ত বিকৃতকাম পুরুষদের কাম বিক্রির খোলাখুলি বিজ্ঞাপন করা দেশটিতে এটা অপ্রত্যাশিত নয়।
২০০৮ সালে UNHCR অবশ্য কায়ানদের দর্শনীয় করে পর্যটন ব্যবসা নিয়ে অস্বস্তি ব্যক্ত করেছে। কায়ানদের কিছু সংখ্যক নিউজ়িল্যান্ডে চলে যায় ২০০৮-এ এবং বাকিরা মূল কারেন্নি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়, যেটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত নয়।
এমন বিচিত্র সৌন্দর্যবোধ আফ্রিকার নেবেল (Ndebele) উপজাতির মধ্যেও দেখা যায়। যথারীতি এখানেও ঐতিহ্য, ঐশ্বর্য, মর্যাদা, সৌন্দর্য ইত্যাদি হল অলংকারের নামে গলায় বোঝা চাপানোর কারণ, এবং উপযুক্ত গলাটা মেয়েদেরই। তবে একমাত্র বিবাহিত মহিলাদেরই পেতল বা তামার আংটা, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে দ্জ়িলা (dzilla), সেটা পরার রীতি।
দেহের অন্যান্য অংশেও রিং পরার রেওয়াজ আছে। রিং বা আংটাগুলো দেয় তাদের বিবাহিত পুরুষরা, যাদের জীবদ্দশায় সেগুলো খোলার অনুমতি নেই। গলায় আদর করলে যে স্নিগ্ধ ভালো লাগা, তা এরা জানলই না।
সুমাত্রার মেনতাওয়াই উপজাতির মানুষদের (Mantawaians) চোখে তীক্ষ্ণ দাঁতযুক্ত মহিলারা অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তাদের বিশ্বাস, মেনতাওয়াইনরা ক্রমশ আত্মা ও শরীরে ভাগ হয়ে গেছে। শরীরটাকে খুশি রাখলে আত্মাও তুষ্ট হয় এবং আত্মার দ্বারা শরীরটাকে পুনরায় গ্রাস করার সম্ভাবনা কমে যায়। তা শরীরকে আনন্দে রাখার উপায় সৌন্দর্যায়ন, আর সৌন্দর্যায়নের একটা পদ্ধতি যেমন সারা গায়ে উল্কি দিয়ে সাজানো, তেমনি আর একটা পদ্ধতি হল দাঁত সূচোলো করা।
এখন দাঁত তীক্ষ্ণ করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সুতরাং এমনতর সৌন্দর্যায়নের জন্য মেয়েদের বাছা হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী? সেই কারণে মেয়েরা একটু বড় হওয়ার পর জোর করে তাদের দাঁত ঘষে দেওয়া হয়। ধারালো ব্লেড দিয়ে দাঁত ঘষার সময় তাদের অজ্ঞান করার বালাই থাকে না। তারপর সারা জীবন ধরে মেয়েটির জিভে ও গামে কামড় পড়ে ক্ষতবিক্ষত হবে কিনা, সেটা কোথাও লেখা নেই। গ্রামের মধ্যে রীতিমতো জনসমাগমের মধ্যে অনুষ্ঠান করে সুন্দরী করার কাজটা সমাধা হয়।
মউরিটানিয়া (Mauritania) নিবাসীর চোখে বউ যত বেশি মোটা হবে, তত ভাগ্য খুলবে, সমৃদ্ধি আসবে। আর সেই কারণে সেদেশের তরুণীদের জোর করে খাওয়ানো হয়। এই প্রথাকে লেবলুহ্ (leblouh) বলে।
ভালো বর জোটানোর জন্য দিনে প্রায় ১৬,০০০ ক্যালোরি খেতে বাধ্য হয় পাত্রীরা, যাতে বিয়ের আগে যথেষ্ট মোটা হতে পারে। Sharon LaFraniere লিখেছেন, “Girls as young as 5 and as old as 19 had to drink up to five gallons of fat-rich camel's or cow's milk daily, aiming for to a burst stomach. The practice was known as gavage, a French term for force-feeding geese to obtain foie gras.” মানে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের প্রতিদিন জোর করে ৫ গ্যালন পর্যন্ত স্নেহ-সমৃদ্ধ উট বা গরুর দুধ গেলানো হয়, যাতে ঊর্ধ্ববাহুতে চামড়া প্রসারণের সাদা-সাদা দাগ তৈরি হয়। বিশ্বের অধিকাংশ সংস্কৃতিতে যা অসুন্দর, সেটাই ওই দেশের মেয়েদের সৌন্দর্যের চিহ্ন।
যদি কোনও মেয়ে অতটা দুধ পান করতে না চায় কিংবা বমি করে ফেলে, তাহলে গ্রামের ওজন বৃদ্ধি বিশারদ (weight-gain specialist) তাকে নানা ভাবে শাস্তি দেয়, যেমন দুটি লাঠির ফাঁকে পা চিপে দেওয়া, মোক্ষম কান মোলা, উরুর ভেতরদিকে চিমটি কাটা, আঙুল উল্টো দিকে বাঁকিয়ে দেওয়া কিংবা নিজের বমি পান করানো! অরুচি আর নিদারণ কষ্টে হাঁসফাস করতে করতে পেট ফেটে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
একাদশ শতাব্দীর এই প্রাচীন প্রথা সামরিক স্বৈরাচার ২০০৮ সালে আবার ফিরিয়ে এনেছে। যতই হোক, ঐতিহ্য রক্ষার দায় তো মেয়েদেরই নিতে হয়। প্রথাটির আন্তর্জাতিক নাম গ্যাভেজ (gavage)। এটি একটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ রাজহাঁসের যকৃত থেকে ফোয়-গ্রাস (foie gras) নামের খাবার তৈরির জন্য তাকে অতিরিক্ত খাওয়ানো। তবে সেই পাখিগুলোর সঙ্গে সম্ভবত এতটা জবরদস্তি ও নিষ্ঠুরতা করতে হয় না।
নারীর বিরুদ্ধে হিংসা (VAW)-র প্রকারভেদ নিয়ে গবেষণার জন্য কিছু ছবি সন্ধান করতে গিয়ে সম্মুখীন হলাম আরেক অবিশ্বাস্য বীভৎসতার, বিকৃতির নিরীখে যার স্থান অনেক ওপরে হওয়ার কথা ছিল। প্রকাভেদে এর নাম ‘Lip Plate’, ‘Lip disc’ বা ‘Mouth Plate’ অথবা ‘Lip Plug’। বাংলায় ‘অধর চাকতি’, ‘ওষ্ঠ চক্র’, ‘অধরোষ্ঠ চক্র’, ঠোঁটের থালা—কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। নমুনাগুলো দেখে ‘অধরোষ্ঠ বন্ধনী’ বা ‘মুখবন্ধনী’ কথাগুলোও মানানসই লাগল, কারণ এর ফলে মুখ নাড়ানোই দায় হয়ে ওঠে।
কখনও ওপরের, কখনও নীচের, কখনও-বা দুটো ঠোঁটেই ছিদ্র করে, সেই ছিদ্র টেনে ফাঁক করে তার মধ্যে মাটি বা কাঠের থালা ঢুকিয়ে দেওয়ার বিকট চর্চা বহু প্রাচীন। অধর ও ওষ্ঠে ছিদ্রকারী যাবতীয় অলংকারকে একত্রে ল্যাবরেট (labret) বলে। অলংকার বলা হলেও এগুলোর উদ্দেশ্য আর যাই হোক, সৌন্দর্যায়ন হতে পারে না; মেয়েদের মুখটিকেও পীড়ন করে বেঁধে ফেলাই লক্ষ্য। আর অন্যান্য প্রথাগত নির্যাতনের মতো এখানেও নারী নিজেই তৎপর আত্মপীড়নে।
পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী দেখা গেছে, ঠোঁট ফুটো করা গয়না বা চাকতি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নানান রূপে বহুবার উদ্ভাবিত হয়েছে। যেমন, আফ্রিকার সুদান, এরিট্রিয়া ও ইথিওপিয়ায় আনুমানিক ৫৫০০-৬০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ, মেসোয়ামেরিকায় ১৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ও উপকূলবর্তী ইকোয়াডরে ৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে এগুলো প্রচলিত।
সবচেয়ে বেশি বিকৃতি দেখা যায় আফ্রিকান দেশগুলিতে, যেখানে অধরের ছিদ্রে এত বড়ো চাকতি আটকানো হয় যে নীচের পাটির ২-৪টি দাঁত উপড়ে ফেলতে হয়। চাদ দেশের ‘সারা’ (Sara) ও ‘লোবি’ (Lobi) জনগোষ্ঠীর মেয়েদের অধরের পাশাপাশি ওষ্ঠেও ফুটো করে থালা/প্লেট বা ডিস্কটা সেখানে গেঁথে দেওয়া হয়। আবার তানজ়ানিয়া ও মোজ়াম্বিকের মাকোন্ডে (Makonde) উপজাতির মধ্যে শুধু ওপরের ঠোঁটে প্লেট পরার করার চল। ওষ্ঠ-চক্রের আকার মেয়েটির পারিবারের সামাজিক ও অর্থনেতিক অবস্থার সূচক। অবশ্য চামড়ার প্রসারক্ষমতার ওপরেও এটা নির্ভর করে। সূচ নয়, মোটা কাঠি দিয়ে ফুটো করা হয়।
ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো নদি-উপত্যকার মুরসি (Mursi) ও সুরমা (Surma) উপজাতির ১৫-১৮ বছরের মেয়েরা বিয়ের ৬-১২ মাস আগে, মা কিংবা কোনো আত্মীয়ার কাছে এই পৈশাচিক পদ্ধতিতে ঠোঁট ফুঁড়িয়ে ফেলে। ১৩ বছরের বালিকাকেও বিবাহযোগ্যা করে তোলার উদাহরণ আছে। ঠোঁটের সঙ্গে ম্যাচিং চাকতি পরার জন্য কানেও প্রকাণ্ড ছ্যাঁদা দেখা যায়। প্রাথমিক ছিদ্রটা করা হয় মোটা ১-২ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠের গুজি (wooden peg) দিয়ে। ২-৩ সপ্তাহ পরে ঘা শুকোলে আগের গুজি সরিয়ে আর-একটু মোটা টুকরো গুঁজে দেওয়া হয়। এভাবে ফুটো বড়ো করে প্রথম ‘গয়না’ পরানো শুরু হয় ৪ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি চাকতিকে সেই ছিদ্রে জোর করে বসিয়ে। চাকতির আকার অতঃপর ক্রমশ বাড়তে থাকে।
লক্ষ্যণীয়, প্রতিটি মেয়ে নিজেরাই নিজেদের যন্ত্রণাদায়ক মুখবন্ধনী তৈরি ও অলংকরণ করে এবং অলংকৃত গয়নার জন্য গর্বও বোধ করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এই চাকতির মাপ ৮ সেন্টিমিটার থেকে শুরু করে ২০ সেন্টিমিটার ছাড়িয়ে যায়। আধুনিক কালে ২০১৪-য় ইথিওপিয়ায় সবচেয়ে পেল্লায় যে ‘অধর চাকতি’র সন্ধান পাওয়া গেছে, তার ব্যাস ১৯.৫ সেন্টিমিটার (৭.৬ ইঞ্চি) ও পরিধি ৫৯.৫ সেন্টিমিটার (২৩.৪ ইঞ্চি)।
১৯৯০ সালে গবেষক বেকউইথ (Beckwith) ও কার্টার (Carter) দাবি করেন, মুরসি ও সুরমা মহিলাদের ক্ষেত্রে চাকতির আকার নির্দেশ করে কন্যাপণ (bride price) স্বরূপ কতগুলো গবাদি পশুর লেনদেন হয়েছে। নৃতাত্ত্বিক টারটন (Turton) অবশ্য এই তত্ত্ব মানতে রাজি নন, যিনি মুরসিদের ওপর ৩০ বছর ধরে গবেষণা করছেন। লাটোস্কি (LaTosky) আবার দাবি করেছেন, অধিকাংশ মুরসি নারী নারীশক্তি ও আত্ম-প্রতীতির পরিচয় স্বরূপ এই গয়না নিয়ে গর্বিত। তা হবে, বাপের প্রতিপত্তি বলে কথা।
ঐ বেঢপ মুখশ্রী দেশের অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ। উনবিংশ শতাব্দীতে ঠোঁটে প্লেট পরা আফ্রিকান মহিলাদের ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ধরে নিয়ে যাওয়া হত সার্কাসে প্রদর্শনের জন্য। ১৯৩০ Ringling Brothers and Barnum & Bailey ফ্রেঞ্চ কঙ্গো (French Congo) থেকে সংগৃহীত ঠোঁট-চাকতি পরিহিতাদের ‘উবাঙ্গি’ (Ubangi) উপজাতির বলে চালিয়েছিল; ‘উবাঙ্গি’ নামটি মানচিত্রে পেয়ে মনে ধরায় এমনিই ব্যবহার করেছিল বলে পরে নিজেরাই স্বীকার করে সার্কাস কোম্পানি। সেই সুবাদে ২০০৯ পর্যন্ত বেশকিছু ইংরেজি অভিধানে Ubangi শব্দটা আফ্রিকান উপজাতিবিশেষ বোঝাতে সংজ্ঞায়িতও হয়ে যায়।
এই উদ্ভট অলংকার চর্চা দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অ্যামাজ়নীয় উপজাতির (Amazonian tribes) পুরুষদের মধ্যেও দেখা গেছে। তরুণরা নারী জগৎ (world of women) ছেড়ে পুরুষগৃহে (men's house) প্রবেশ করার সময় পরে। সচরাচর সুবক্তা ও নেতৃত্বস্থানীয় পুরুষরা ঠোঁটে ল্যাবরেট পরে নিজেদের অবস্থান জানান দিত। যেমন কায়াপো (Kayapo) উপজাতির প্রধান। তবে তাদের মুখ-চাকতিগুলো ইথিওপিয়ান মেয়েদের মতো প্রকাণ্ড ও ভারী নয়, হাল্কা কাঠের তৈরি।
তাছাড়া ব্রাজ়িলের ‘সুয়া’ (Suyá) জাতির পুরুষদের মধ্যে, উপকূলবর্তী ব্রাজ়িলের বোটোকিউডো (Botocudo) জনগোষ্ঠীর উভয় লিঙ্গে এবং উত্তর কানাডা ও আলাস্কার অ্যালিউট (Aleut), ইনুইট (Inuit) ও অন্যান্য আদিবাসীদের মধ্যেও এই ঠোঁটে গয়না পরার চল ছিল বা আছে। গুয়ারানি (Guarani), টুপি (Tupi) ও চিরিগুয়ানো (Chiriguano)-র উপজাতিগুলো, ব্রাজিলের জ়ো (Zo'e) জনগোষ্ঠী, ওদিকে সুদানের নুবা (Nuba), পশ্চিম আফ্রিকার লোবি (Lobi)—এরা আবার প্রসারিত ঠোঁটে প্লাগ বা লম্বাটে রডের মতো গয়না পরত বা এখনও কদাচিত পরে। এগুলোর নাম টেম্বেটা (tembetá)।
উত্তর আমেরিকায় উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় (Pacific Northwest) উপজাতিতে ল্যাব্রেট পরার রেওয়াজ অন্তত ৫০০০ বছরের পুরোনো। প্রথম দিকে নারী-পুরুষ উভয়েই পরত; কিন্তু ১৯ শতক থেকে শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ মেয়েদের অলংকার হয়ে গেছে। হাইদা (Haida), সিমশায়ান (Tsimshian) ও ট্লিংগিট (Tlingit) গোষ্ঠীর মধ্যেও মেয়েরা পরিণত বিবাহযোগ্যা বোঝাতে ঠোঁট ফুটো করে। প্রথম প্লেট বসানো রীতিমতো ভুরিভোজ দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
ঠোঁটে ছিদ্র করার সময়, বিশেষত বারবার ঘা শুকিয়ে আসা ছিদ্রকে আবার চিরে ফাঁক করার সময়কার তীব্র যন্ত্রণা তো আছেই, সেইসঙ্গে চাকতি পরে খাওয়া-দাওয়া, লালা নিঃসরণ—সবকিছুই যে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাড়িতেও সংক্রমণ হয়, বিশেষ করে ইথিওপিয়ান মেয়েদের মতো সুস্থ কাঁচা দাঁত উপড়ে ফেলতে হলে। তাই পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ল্যাব্রেট বা লিপ-প্লেট পরা বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন :—
চাদের ‘সারা’ রমণীরা ১৯২০ সাল থেকে ল্যাব্রেট বা অধরোষ্ঠ চক্র পরা ছেড়ে দিয়েছে। তানজ়ানিয়া ও মোজ়াম্বিকের ‘মাকোন্ডে’ উপজাতি বেশ কয়েক দশক আগে বন্ধ করেছে। ব্রাজ়িলের ‘সুয়া’ পুরুষরা আর ঠোঁট ফোঁড়ায় না। বোটোকিউডোরাও মোটামুটি গত শতাব্দীতে ছেড়ে দিয়েছে। কানাডা ও আলাস্কার উপজাতিগুলিও অধিকাংশ বিংশ শতাব্দীতে ল্যাব্রেট ত্যাগ করেছে। কিন্তু আফ্রিকা এখনও জীবন্ত যাদুঘর।
এখনও পর্যন্ত এই বিকট ঐতিহ্য বহন করে যাচ্ছে ইথিওপিয়ার মুরসি ও সুরমা বা সুরি জনগোষ্ঠীর নারীরা। অতি সম্প্রতি বিবাহযোগ্যা মেয়েরা অধিকার পেয়েছে লিপ-প্লেট পরবে কিনা সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সেটাও কতজন নিতে পারে সন্দেহ; কারণ ঐতিহ্যের নামে মস্তিষ্ক প্রক্ষালন ও অভ্যস্ত দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব আইনি হস্তক্ষেপ ছাড়া কাটানো সম্ভব নয়। ইদানীং ইথিওপিয়া সরকারও এই প্রথা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে, তবে নিষিদ্ধ করেনি।
ওদিকে পশ্চিমি দুনিয়ার তরুণ প্রজন্মের কিছু বদ্ধ উন্মাদ ‘আধুনিক আদিম’ (Modern Primitive) আন্দোলনের নামে নিজেদের ঠোঁটে ছোট বড়ো ছ্যাঁদা করাচ্ছে ‘সঠিক’ অলংকার পরিধান করবে বলে। এরই নানা রূপভেদ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ফোঁড়াফুঁড়ি আংটা-মাকড়ির মধ্যে প্রকাশ পায়।
স্ত্রী জননাঙ্গ বিকৃতি, স্তন ইস্ত্রি—এগুলোর বিরুদ্ধে যেমন আন্তর্জাতিক মহল সরব, এই বীভৎসতার বিরুদ্ধে কিন্তু তেমন কিছু শোনাই যায় না। এমনকি নারীর বিরুদ্ধে হিংসা (VAW) হিসাবেও শনাক্ত হয়নি। কারণটা কী? পুরুষদের মধ্যেও এর চল ছিল বলে, নাকি ঠোঁটের অলংকার হিসাবে পরিচিত বলে, নাকি কিছু বিকৃতকাম মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে বলে? জানা নেই, তবে এই প্রথা লিঙ্গনির্ভর নিষ্ঠুরতা হিসাবেও আলোচিত নয়, যদিও এই বিকট সৌন্দর্যায়নের পরীক্ষাগার নারী অঙ্গই; তারপর ছড়িয়ে পড়ছে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা, প্রিমিটিভ মুভমেন্টের ছদ্মবেশে।
REFERENCES: