নারীর প্রতি হিংসা বা Violence against Women (VAW) বলতে বোঝায় যৌন ও লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসা (Sexual and Gender-based Violence - SGBV)। এগুলোকে সচরাচর বিদ্বেষ বা ঘৃণাজাত অপরাধ মনে করা হয়, যেখানে একজনের ওপর অত্যাচার করার একমাত্র কারণ সে নারী বা বালিকা বা কন্যাশিশু।
‘লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসা’কেও সংজ্ঞায়িত করে বলা হয়েছে: মেয়েদের শারীরিক, মানসিক বা যৌনভাবে আঘাত করা বা কষ্ট পেতে বাধ্য করা। ‘লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসা’ বলতে প্রায়ই মূলত ‘নারীর প্রতি হিংসা’কেই বোঝায়। আর এই হিংসা সংঘটনে পুরুষরাই সচরাচর প্রধান কুশীলব। তবে অনেক প্রথাগত অত্যাচারে নারীরাও নারীনির্যাতনে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘ নারীর প্রতি হিংসা অপনয়নের যে ঘোষণা করে, তাতেও স্বীকার করা হয়েছে এই ‘লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসা’র শিকড় রয়েছে নারী ও পুরুষের অসাম্যে, যেখানে মেয়েরাই একতরফা বলি হয়। উক্ত ঘোষণায় আরও বলা হয়, সোজা কথায় নারীর প্রতি হিংসা চিরাচরিত অসম ক্ষমতায়নেরই প্রতিফলন; এবং এই হিংসা আসলে নারীকে পুরুষের অধীনস্থ রাখার একটি সামাজিক পদ্ধতি।
নারীর প্রতি হিংসা বা লিঙ্গহিংসাগুলিকে আমি তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছি—
ক. প্রথাসিদ্ধ নির্যাতন (Ritualised Torture or Torture as Tradition)
খ. অপরাধ পদবাচ্য নির্যাতন (Torture regarded as Crime)
গ. রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসাবে নির্যাতন (Torture as State Policy)
पितৃতান্ত্রিক সমাজেও ধর্ষণ সচরাচর অপরাধ মনে করা হলেও নারীকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তার প্রয়োগ সমাজ অনুমোদিত। সেই ধর্ষণ যে প্রকাশ্য খেলা হতে পারে, এবং তাতে যে সহস্র পুরুষ সহর্ষে যোগদান করতে পারে, তার একাধিক নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম হল ‘তাহরুশ জামাই’, যা ব্যাপক হারে গণ লৈঙ্গিক নিগ্রহ (mass sexual assault) বলে পরিচিত। যেহেতু এগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের মদতে বা প্রশ্রয়েই হয়ে থাকে, সুতরাং একে ‘রাষ্ট্রীয় কৌশলগত নারীনির্যাতন’ও বলা যায়।
প্রথাটা আরবের, তবে ২০০৫ সালের পর মিশরের সৌজন্যে সংবাদ শিরোনামে আসে। মিশরে ২৫শে মে ২০০৫ সালে খোদ রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ার (Tahrir Square) এলাকায় মেয়েরা একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। মেয়েদের দমন করে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে মিশরীয় সুরক্ষা বল (Egyptian Security Forces) ও বাসে করে নিয়ে আসা তাদের ভাড়াটে দালালরা প্রকাশ্যে যৌন নির্যাতন করে। মেয়েদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালীন বাসে চড়ে এক দঙ্গল ছেলে এসে পুলিশের সামনে, তাদের প্রচ্ছন্ন মদতেই নির্যাতন চালায়। দিনটা ‘কালো বুধবার’ (Black Wednesday) নামে উল্লিখিত হয়। পুলিশের ভূমিকা ছিল উল্লসিত দর্শকের।
২০০৫ সালে ঘটা এই জঘন্য ঘটনার পর কোনও হামলাবাজের শাস্তি হওয়া তো দূর, উল্টে তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১২ সালের মধ্যে পুরুষ জনতার দ্বারা মেয়েদের ওপর গণ লিঙ্গ হিংসা যে কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি ও ধর্মীয় উৎসবের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে; এবং সেটা মিশরীয় সরকারের মদতেই, যাতে মূলত মিশরের অল্পবয়সী ছেলেদের বিশেষ অংশগ্রহণ থাকে।
যে ঘটনা নিয়ে বেশি তোলপাড় হয়েছিল সেটা হল: ২০০৬ সালের ২৪ অক্টোবর ‘ইদ-আল-ফিতর’-এর দিন কায়রোর তালাত হার্ব স্ট্রীট (Talaat Harb Street)-এর একটি সিনেমা হলে কিছু ছেলে প্রবেশাধিকার না পেয়ে সংলগ্ন এলাকার পথচারী মেয়েদের ওপর চড়াও হয়ে লিঙ্গ-শরীরী নির্যাতনে মেতে ওঠে। সেই সুযোগে আশপাশের পুরুষরাও যোগ দেয়। ৪ ঘণ্টা ধরে চলে সেই ধর্ষণ-নির্যাতন কাণ্ড। মেয়েদের কোনও কর্মসূচি চলছিল না যে শিক্ষা দিতে হবে। নিছক খেয়াল ও অজুহাত, যাতে মেয়েদের যখন-তখন হেনস্থা করা যায়। সেবারও পুলিশের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকেরই, যদিও কিছু পথচারী নাকি মেয়েদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল বলেও খবর।
এই ধর্ষণোৎসবের নামই ‘তাহরুশ জামাই/জিনসি’ (taharrush jinsi)। পদ্ধতিটা হল উদ্দিষ্ট প্রতিটি মেয়েকে আলাদা করে তিনটি বৃত্তে ঘিরে ফেলা। সবচেয়ে ভেতরের প্রথম বৃত্তে থাকে আসল দস্যুরা, যারা মেয়েদের ঘিরে ধরে দেহ হাতড়ায়, মারধোর করে, শরীরে আঙুল প্রবেশ করায় এবং পূর্ণাঙ্গ ধর্ষণ করে। তাদের ঘিরে ও ভেদ করে শিকারের কাছে আসার চেষ্টা ও অত্যাচারে সহযোগিতা চালায় দ্বিতীয় বৃত্তের পুরুষরা। আর সবচেয়ে বাইরের বৃত্তের পুরুষদের কাজ আশপাশের জনগণের কাছে মেয়েটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করার ভান করে নির্যাতকদের নিরাপত্তা দেওয়া। আসলে তাদের কাজ রক্ষাকারীদের আটকে রাখা। অবশ্য তেমন সদিচ্ছা ও দুঃসাহস দেখাতে ক’জন এগিয়ে আসে সন্দেহ।
এই মারণ বৃত্তের নাম “নরক বৃত্ত” বা "Circle of Hell"। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী পুরুষরা ৭ থেকে ৭০ যেকোনো মেয়েকে ঘিরে ধরে পোশাক ছিঁড়ে, যোনি ও পায়ু—আঙুল বা কাঠি বা ধারালো ছুরি, ব্লেড ইত্যাদি দিয়ে খুঁচিয়ে, যোনিতে ধারালো বস্তু ঢুকিয়ে, প্রচণ্ড মারধোর করে ও অবশ্যই সাধ্যমতো ধর্ষণ করে। স্ত্রী অঙ্গের প্রতি বিশেষ ধর্মানুগত পুরুষদের আক্রোশের নিদর্শন অবশ্য বারবার পাওয়া যায়। জীবিত ভুক্তভোগীর জবানিতে জানা গেছে, হামলাবাজরা আবার মুখে “ভয় পেও না” বলে অভয় দিয়ে সাহায্য করার ভানও করে।
ইসলামিক আদর্শ (Islamic Ideology) অনুযায়ী নারীকে বাড়ির বাইরে পা রাখার শাস্তি স্বরূপ ও জনজীবন সম্পর্কে ভীত করে তুলতে যৌন হিংসা করা যেতেই পারে। এর উদ্দেশ্য মেয়েটিকে লজ্জা দেওয়া, নির্যাতকদের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। যুক্তি অকাট্য, মানতেই হবে। তবে আন্তর্জাতিক মহলে হেলদোল দেখা যায় ২০১১-র ফেব্রুয়ারিতে American network CBS-এর মার্কিন মহিলা সাংবাদিক লারা লোগান (Lara Logan) ‘মিশরীয় বিপ্লব’ (Egyptian Revolution)-এর ওপর সংবাদ সংগ্রহের সময় একইভাবে আক্রান্ত হওয়ার পর। মিশরের সংবাদ মাধ্যম আল আখবার ২০১২ নাগাদ জানিয়েছে, তাহরুশ জামাই মিশরের ধর্মীয় উৎসবগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ("prominent feature of religious festivals in Egypt") হয়ে উঠেছে।
OpAntiSH (Operation Anti Sexual Harassment)-র মতো কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে জানা যায়, শুধু ২০১৩-র ২৫শে জানুয়ারিতেই অনুরূপ ১৯টি ঘটনা ঘটে, যেখানে লিঙ্গ হামলাবাজরা ছিল ২০-৩০ বছরের তরুণ আর আক্রান্ত মেয়েদের মধ্যে ৭ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধা—কেউ বাদ ছিল না। উদ্ধারকারী ১৫টি দল যেতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের কাছে জানা যায় ঐ কাণ্ড চলাকালীন সাময়িক কিছু চায়ের দোকানও বসে গিয়েছিল। উদ্ধারকারীরা আক্রান্ত মেয়েদের সাহায্য করার চেষ্টা করলে সেই চায়ের দোকানগুলো থেকে তাদের গায়ে ফুটন্ত জলও ছোঁড়া হয়। ২০১৩-র কায়রোতে সংঘটিত সেই ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয় ততক্ষণ, যতক্ষণ না ড্রাইভার জানায়, মেয়েটি মারা গেছে।তে সংঘটিত সেই ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখা হয় ততক্ষণ, যতক্ষণ না ড্রাইভার জানায়, মেয়েটি মারা গেছে।
কতটা সংগঠিত এই নারীবিদ্বেষী নির্যাতন উৎসব, ভাবা যায়! সেটা অভাবনীয় হলেও সত্যি। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আক্রমণ চিরাচরিত ইসলামিক নারীবিদ্বেষের পরিচয়, যেখানে মেয়েদের চূড়ান্ত আতঙ্কিত করে বহির্জগতে পা রাখা আটকানোই উদ্দেশ্য; যা ২০০৫ থেকে ২০১২-র জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পরিলক্ষিত হয়েছে।
মিশরে ২০০৬ সালের আগে মেয়েদের যৌন বা লৈঙ্গিক নির্যাতন কদাচিৎ আলোচিত হয়েছে। মিশরীয় নারী অধিকার কেন্দ্র (Egyptian Center for Women's Rights) এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে জনগণ সেসব মিশরীয় সমাজে ‘আমেরিকান ধ্যানধারণা চাপানো হচ্ছে’ বলে উড়িয়ে দেয়।
Institute of Development Studies-এর মারিজ় ট্যাডরস (Mariz Tadros) এই যৌন নির্যাতনের পেছনে সামাজিক কারণ হিসাবে অনেকগুলো উপাদান দেখিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে যৌন চাহিদা, নারীকে পদানত করার বাসনা, টাকার অভাবে বিয়ে না হওয়ায় যৌন বঞ্চনা-বোধ (perceived sense of sexual deprivation) ইত্যাদি। মানে বেচারা পুরুষদের নিজস্ব হতাশা — যেমন আর্থিক অসুবিধার জন্য বিবাহিত জীবনে যথেষ্ট সেক্স থেকে পুরুষরা বঞ্চিত হচ্ছে ইত্যাদি। Sex and the Citadel (2013)-এর লেখিকা, সাংবাদিক তদুপরি United Nations’ Global Commission on H.I.V. and the Law-র ভাইস চেয়ারপারসন শিরীন এল ফেকি (Shereen El Feki) আবার সাধারণ্যে যৌন নিগ্রহের (sexual harassment in general (taharrush jinsi)) মতো যাবতীয় অপকর্মের মূলে বেকারত্ব, সামাজিক মাধ্যম এবং কাজের চাপে পারিবারিক নজরদারির ভাঙনকে (breakdown of family surveillance) দায়ী করেছেন। কারণ বাবা-মা উভয়েই অত্যধিক কাজের চাপে বাড়ির দিকে যথেষ্ট নজরদারি চালাতে পারে না বলেই এমনটা ঘটে যায়। মানে নজরদারির অভাবজনিত সমস্যা মেয়েদের বেলা হয় না, কিন্তু মা কাজে ব্যস্ত থাকলে ছেলেরা এমন হিংস্র দানব হয়ে উঠতেই পারে।
মানতেই হবে সবকটি কারণই অত্যন্ত সঙ্গত এবং সেগুলোর ফলে মেয়েদের সঙ্গে পুরুষ মানুষ যা ইচ্ছা তাই করার ছাড়পত্র পেতে পারে। পুরুষালি অপরাধগুলোর ওপর সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম, অন্তর্জাল, পরিবার, রাষ্ট্র ইত্যাদি ইত্যাদির ভূমিকার আবরণ না চাপালে রক্ষা নেই। নতুবা সত্যিটা ফাঁস করলে যারা কোনো নারীকে সম্মানের শিখরে বসিয়েছে, তারাই দলবদ্ধভাবে পাঁকে ডুবিয়ে দেবে। শুরু হয়ে যাবে ভার্চুয়াল তাহরুশ জামাই, যা বর্তমান লেখিকার কপালে সামাজিক মাধ্যমে বারবার জুটেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, একটি সমীক্ষায় মিশরের ৭৫% স্বল্পশিক্ষিত ও ৬০% উচ্চতম শিক্ষায় শিক্ষিত নারী এমন নৃশংসতা ও নোংরামোর জন্য মেয়েদের উত্তেজক পোশাক পরিধানকে দায়ী করেছে। আর পুরুষরা যে প্রায় সকলেই (৯৭.২%) মেয়েদের আঁটোসাঁটো পোশাক ও যথেষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন না মেনে চলাকে দায়ী করবে, তাতে আর বিস্ময় কী? বিভিন্ন সমীক্ষক ও সমাজকর্মী এই গণ-লিঙ্গহিংসা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে হিংসা হিসাবে শনাক্ত করা ছাড়া নতুন কোনো তত্ত্ব দিতে পারেননি। সুতরাং মিশরের অনুপ্রেরণায় অন্যান্য কিছু ইসলামিক রাষ্ট্রে এমনকি ইউরোপের কিছু অঞ্চলেও যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে বা ঘটতে থাকে, তাহলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।
স্ত্রীজননাঙ্গকে কেটেছিঁড়ে সেলাই করে বদ্ধ বিকৃত রেখেও ধর্ষণের উন্মাদনা কোথা থেকে জোটায় পুরুষরা, ভাবলে যৌনতার সঙ্গে যোনির সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
তথ্যসূত্র